চোখের জলে ভাসছে স্বপ্ন: হাওরে এবার কেমন কাটবে কুরবানীর ঈদ?


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : মে ১৭, ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ন /
চোখের জলে ভাসছে স্বপ্ন: হাওরে এবার কেমন কাটবে কুরবানীর ঈদ?
হাবিবুর রহমান হাবিব
চারিদিকে ঈদের আনন্দ, খুশির আমেজ। অথচ একটি অঞ্চলের মানুষের বুকে চলছে বোবা কান্না। যে সময়ে কৃষকের ঘরে নতুন ধানের গন্ধে উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধু থৈ থৈ পানি আর শূন্যতা। অকাল বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের চোখের সামনে তলিয়ে গেছে তাদের একমাত্র স্বপ্নের ফসল বোরো ধান। ধানের সাথে মিশে গেছে তাদের ঘাম, শ্রম আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই চরম বাস্তবতার মাঝেই দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানীর ঈদ।
​প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওর পাড়ের মানুষের জীবনের হিসাব-নিকাশ আর দশটা অঞ্চলের মতো নয়।
​এখানকার অর্থনীতি, উৎসবের আনন্দ, এমনকি অবুঝ সন্তানের মুখের চিলতে হাসি—সবকিছুই আবর্তিত হয় বছরের এই একটিমাত্র ফসলকে কেন্দ্র করে। বোরো ধান ঘরে তুলে কৃষক ঋণ শোধ করেন, জীর্ণ ঘর মেরামত করেন, আর পরিবারের জন্য উৎসবের রসদ জোগান। চারটি জেলার লাখ লাখ প্রান্তিক চাষী এবারও আশা করেছিলেন, ধান বিক্রির টাকা দিয়ে ঈদে একটা কুরবানীর পশু কিনবেন, সন্তানদের মুখে তুলে দেবেন ঈদের সেরা আনন্দটুকু। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই স্বপ্ন এখন পানির নিচে।
​একদিকে ফসল হারানোর ক্ষত, অন্যদিকে উৎসবের দিনে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানোর তাগিদ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দিশেহারা হাওরের মানুষ। পশুর হাটগুলোতে যেখানে উৎসবের আমেজ থাকার কথা, সেখানে এবার বিরাজ করছে স্থবিরতা। অনেক কৃষক পরিবার সারা বছর ধরে একটি গরু লালন-পালন করেছিলেন এই আশায় যে, ঈদে সেটি বিক্রি করে ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নেবেন। কিন্তু স্থানীয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায়, তারা এখন বাধ্য হচ্ছেন নামমাত্র দামে নিজেদের আদরের পশুটি বিক্রি করে দিতে।
​সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কোমলমতি শিশুদের ওপর। নতুন জামাকাপড়, জুতো আর ঈদের দিন সকালে সেমাই-চিনির যে চিলতে আনন্দ, তা থেকেও এবার বঞ্চিত হতে যাচ্ছে হাওরের হাজারো শিশু। বাবার শূন্য পকেটের দিকে তাকিয়ে অনেক সন্তান এবার আর নতুন কাপড়ের আবদার করার সাহসটুকুও পাচ্ছে না। ঋণ বা চড়া সুদে দাদন নিয়ে যারা ফসল বুনেছিলেন, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ফসল তো গেলই, এখন ঈদের খুশির চেয়েও পাওনাদারদের তাগাদা এবং আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে—সেই দুশ্চিন্তা তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
​উৎসবের এই দিনে হাওরের এই প্রান্তিক ও মেহনতি মানুষদের আমরা এভাবে একাকী ছেড়ে দিতে পারি না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের পাশাপাশি বিত্তবান, প্রবাসী এবং বিভিন্ন সামাজিক-মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি আকুল আহ্বান—আপনারা এই ঈদে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়ান। আপনাদের কুরবানীর আনন্দের একটি অংশ যেন পৌঁছে যায় এই দুর্গত মানুষের দুয়ারে।
​প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা হাওরের মানুষ অত্যন্ত সহনশীল। সব হারানোর বেদনার মাঝেও তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে। চোখের জলে স্বপ্ন ভাসলেও, সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এই ঈদে হাওরের প্রতিটি ঘরে অন্তত এক ফোঁটা হাসির রেখা ফুটে উঠুক—এটাই হোক আমাদের এবারের ঈদের অঙ্গীকার।