
জয়শ্রী মোহন তালুকদার
গল্পের শুরুটা পলাশপুর গ্রামকে নিয়ে। সেই গ্রামে বসবাস করত আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে শিবপ্রসাদ বাগচি।সবাই চিনত এই পরিবারকে। অত্যন্ত বনেদি এবং ভালো মানুষ হিসাবে সেই সময় সবার কাছে পরিগনিত হতো এই শিবপ্রসাদ বাগচি। উঁচু লম্বা গায়ের রং দুধে আলতা হলেও এই শিবপ্রসাদ বাগচিরএকটি খারাপ অভ্যাস ছিল। গল্পেরশুরুতে নাইবা বললাম সেই অভ্যাসের কথা। বয়স যখন ত্রিশের ঘরে তখন উনি বিয়ে করেন পাশের গ্রামের।নন্দিনীকে।
দেখতে পরম সুন্দরী ছিল নন্দিনী। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত সবাই তাঁর চোখের দিকে । কাজল কালো চোখ আর অনেক লম্বা চুল ছিল নন্দিনীর। বাড়ির পাশের ঘাটে স্নান করতে যেতো নন্দিনী প্রতিদিন।সঙ্গে থাকত দাসি। স্নানশেষে পুকুর থেকে এক ঘটি জল নিয়ে নন্দিনী বাসায় আসতো,আর সেইজল ঢালতো বাগচি পরিবারের তুলসী বেদিতে। নন্দিনি যখন বিয়ে হয়ে আসে তখন তাঁর শাশুড়ি মা বলেছিল তাঁকে পারিবারিক অভ্যাসটি যেন সে ধরে রাখে। বড়দের কোন কথায় না ছিল না তাঁর। লক্ষীমন্ত বউ বলতে যা বোঝায় তঁার সবটুকুই বিদ্যমান ছিল তাঁর চরিত্রে।
ঠিক এক বছরের মাথায় নন্দিনী গর্ভবতী হয়। অনেক আদর নন্দিনীর জন্য ধরা থাকে তখন বাগচি পরিবারে। অগনিত দাস-দাসী সারাদিন দেখাশুনা করে নন্দিনীর।শহর থেকে ডাক্তার বাসায় নিয়ে এসে দেখানো হয় মাসে একবার করে। ঠিক যখন সাত মাস শুরু হয় তখন নন্দিনীর একটু একটু করে শারীরিক অসুবিধা দেখা দিতে থাকে।
বউ গর্ভবতী হলেও শিবপ্রসাদ বাগচী তেমন একটি খেয়াল রাখত না নন্দিনীর দিকে।সারাদিন জমিদারি আর আশেপাশের গ্রামের বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকত শিবপ্রসাদ বাগচি। পলাশপুর গ্রামের রেনুবালা দিদিকে চিনত না সেই সময়ে এমন কেউ ছিল না।ধাত্রী দিদি নামে পরিচিত ছিল সবার কাছে। যার ঘরে গর্ভবতী কোন মেয়ে থাকতো আগে থেকেই তাকে ঠিক করে রাখতো।রেনু বালা দিদি ছিল বিধবা, বয়স ছিল ৫০ ঘরে।
হিন্দু সমাজে মেয়েরা গর্ভবতীহলে৮মাসেএকটি অনুষ্ঠান করা হয় সেই অনুষ্ঠানের নাম সাধভক্ষণ এই অনুষ্ঠানের দিন রেনু বালাদি নন্দিনী কে দেখে বলে ওগো বউ তোমার মনে হয় আর দেরি নেই আমরা খুব তাড়াতাড়ি নাতির মুখ দেখবো ।
সে সময়ে হিন্দু পরিবারের প্রত্যেকেরই একটি করে ঠিকানা থাকতো ভারতে। বাাগচি পরিবারেরও সে ক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম ছিল না। শিবপ্রসাদ বাগচীর বড় ভাই হরিপ্রসাদ বাগচি থাকত ভারতের ব্যারাকপুরে।তিন তলা বাসা নিজ পছন্দ মত তৈরি করেছিলেন উনি ।বাড়িটি ছিল গঙ্গার ধারে । দুই ভাই একজন বাংলাদেশে আর একজন ভারতে। এটা নিয়ে অবশ্য কর্তাবাবুর এক ধরনের অহংকারই ছিল । পলাশপুর গ্রামের মানুষকে উনি বলতেন আমার দেহের একাংশ রেখেছি বাংলাদেশে আর এক একাংশ রেখেছি ভারতে। কোন অসুবিধা নেই আমার ।বাড়ির চাকর রমেনএটা শুনে বলতো বাবু গো আমাগোও নিও বাবু আপনাদের লগে।
বছরে একটি পূজা পলাশপুর গ্রামে খুব বড় করে হত সেটা হল মনসা দেবীর পূজা। বাড়ির জামাই মেয়ে সন্তান যারা থাকতো তারা আসতো প্রত্যেক পরিবারে।প্রত্যেক ঘরে আত্মীয়-স্বজনেভরে যেতা। প্রতিবছর বাগচি পরিবারের বড় সন্তান এই পূজোর সময় বাংলাদেশে আসতো। এই বছরের পূজাটা বড় কর্তা একটু অন্যভাবে সম্পন্ন করবেন বলে স্থির করেছেন। উনি পূজাএবার বাড়ির ঘরে না করে মন্ডপের বাহিরে করবেন যাতে গ্রামের মানুষসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষরা বেশি করে আনন্দ করতে পারে।
পুজোর একদিন আগে হরিপ্রসাদ বাগচী এসেছে। সারা বাড়ি জুড়ে রয়েছে আনন্দের এক মহা আমেজ।পরের দিন পুজা। দাস দাসীরা সবাই পূজোর কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এবার মন্ডপের বাইরে পূজা হবে তাই প্রতিবারের তুলনায় কাজও একটু বেশি। পূজার দিন সকাল থেকেই নন্দিনীর শরীরটা ভালো লাগছিল না। সে কোন কিছু করেই শান্তি পাচ্ছিল না শুধু বিছানায় ছটফট করছিল। মন খুলে সে কাউকে বলতেও পারছিল না যে তার কি অসুবিধা হচ্ছে।
পুজা শেষ সবার পরে নন্দিনীকে ডেকে পাঠানো হয়। বড় কর্তা বাবু বলে নন্দিনীকে প্রণাম দেওয়ার জন্য। কিন্তু নন্দিনী তো একদম ভালো লাগে না।নন্দিনী মনে করে এতটুকু রাস্তা সে কি করে হেঁটে যাবে। তলপেটের চারপাশে তাঁর ব্যাথা শৃরু হয়। কিন্তু নন্দিনী বুঝতে দেয় না। নন্দিনী ভাবে পূজাটা ভালোভাবে শেষ হয়ে যাক। তার কারনে যেন পূজা বিঘ্নিত না হয়। অনেক আশা অনেক আনন্দ এই মনসা পূজাতে বাগচি পরিবারে।
পুজা দেখে নন্দিনী ঘরে ফিরে, কিন্তু নন্দিনী তো ভালো নেই শরীরের মধ্যে অসহ্য রকমের যন্ত্রণা নন্দিনীর। বসতে পারছে না, শুতে পারছে না, আবার তাঁর ব্যথার কথা বলতেও পারছে না। চেষ্টা করছে নন্দিনী যাতে প্রচন্ড ভালোভাবে শেষ হয়ে যায়পুজোটা। প্রতিবছরে এক বারই পুজো হয় বাগচি পরিবারে অনেক আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। সেটা মা মনোসার পুজো।
ভোরবেলা সময় নন্দিনী চিৎকার দিয়ে বলে ও মাগো আমাকে বাঁচাও। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তাঁর চিৎকার শুনে দাস দাসীরা ছুটে আসে নন্দিনীর ঘরে। আলো জ্বালিয়ে দেয় নন্দিনী ঘরে।দেখে বিছানায় ছটপট করছে নন্দিনী। শিবপ্রসাদ বাগচী রেনু বালা দিদির কাছে খবর পাঠায় তাড়াতাড়ি আসার জন্য। কিন্তুু সেই সময় টুকু নন্দিনী দেয় না। রেনু বালা দিদির আসার আগেই নন্দিনী একটি কন্যা সন্তান বাগচী পরিবারের জন্য রেখে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে।অতিরিক্ত উচ্চ রক্তচাপের কারনে নন্দিনী মারা যায়।কিন্তু এই মৃত্যু মেনে নিতে পারে না শিবপ্রসাদ বাবু।
নন্দিনীর মৃত্যুর পর যেন পলাশপুর গ্রামে এক গভীর অন্ধকার নেমে এলো। বাগচি পরিবারের আঙিনায় আর হাসির শব্দ শোনা যেত না। পূজার পরের বছর থেকে মনসা পুজো আর ঘরে হয়নি। শিবপ্রসাদ বাগচি নিজের ঘরে নিজেকে আটকে রাখতেন দিনের পর দিন। কারো সঙ্গে কথা বলতেন না, খেতেও অনীহা। চোখের কোণে শুধু একটাই দৃশ্য ঘুরে বেড়াত — নন্দিনীর শেষ মুহূর্তের চিৎকার, আর সেই কন্যা শিশুর কান্না।
শিশুটি বেঁচে ছিল, একদম নন্দিনীর মতো চোখ আর কপালে ছোট্ট টিপের মতো কালো দাগ। নাম রাখা হয় “মাধবী”। কিন্তু বাবা তাকে একটিবারের জন্যও কোলে নেননি। তার মনে গভীর ক্ষোভ ছিল নিজের উপর— “আমি যদি সেদিন একটু খেয়াল রাখতাম, নন্দিনী বাঁচতো।”
বছর গড়ায়, দশক পার হয়। মাধবী বড় হয়ে ওঠে দিদি রেনুবালার আদরে। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল সে, পলাশপুরের প্রথম মেয়ে যে শহরে কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু বাবার সঙ্গে তার দূরত্ব কখনো ঘোচে না। শিবপ্রসাদ বাগচি বৃদ্ধ হন, নীরব হন, মাধবী তবু প্রতিদিন সন্ধ্যায় তুলসী বেদিতে জল ঢালে— একদম তার মায়ের মতো।
বছর চল্লিশ পর,
গ্রামের মানুষ এখন কেউ কেউ মনে রাখে সেই বনেদি বাগচি পরিবারের গল্প, কেউ আবার জানেই না।
পুরনো বাড়ির ভাঙা ছাদের নিচে এখন শুধু স্মৃতি।
শহর থেকে এক বয়স্ক মহিলা ফেরে মাঝে মাঝে, হাতে ফুল আর ছোট্ট ঘটি।
সে চুপচাপ বসে থাকে তুলসী বেদির পাশে।
লোকজন জিজ্ঞেস করে,
— “ঠাকুরঝি, আপনি কে?”
মৃদু হেসে বলে,
— “আমি মাধবী বাগচি… ফিরে দেখতে এসেছি মা’কে, যিনি এই বেদিতে জল ঢেলে যেতেন প্রতিদিন।”
তুলসীর পাতায় শিশির পড়ে, বাতাসে ভেসে আসে দূরের ঘন্টাধ্বনি।
আর পলাশপুরের বাতাসে যেন নন্দিনীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে —
“আমি আছি, মাধবী… আমি এখানেই আছি।
সমাপ্ত।।
আপনার মতামত লিখুন :