আঙুলের ডগায় মহাবিশ্ব


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : মার্চ ১২, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন /
আঙুলের ডগায় মহাবিশ্ব

হাবিবুর রহমান হাবিব

সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলা সদরের এক শান্ত বিকেল। ড. জাভেদ তাঁর ব্যক্তিগত ল্যাবে নিবিষ্ট মনে কাজ করছেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের পেশাদার জীবনে তিনি ছিলেন একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। হাজারো মানুষের আঙুলের ছাপ বা ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ তাঁর চোখের সামনে দিয়ে গেছে। প্রতিটি ছাপ যেন একেকটি রহস্যের চাবিকাঠি, যা অপরাধীকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করতে পারে।
​আজ লেন্সের নিচে একটি অতি পুরনো হাড়ের নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ তিনি থমকে গেলেন। ল্যাবের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল ভেড়াঢহর হাওরের বিশাল জলরাশি আর দূরে বয়ে চলা কালনী নদীর শান্ত স্রোত। প্রকৃতির এই বিশালতার মাঝে নিজের অস্তিত্বকে খুব তুচ্ছ মনে হলো তাঁর। তিনি ভাবলেন—মৃত্যুর পর যখন দেহটি পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যাবে, তখন কী করে মানুষকে আবার অবিকল জীবিত করা সম্ভব?

ঠিক তখনই তাঁর শৈশবে পড়া পবিত্র কুরআনের সেই আয়াতটি হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হলো: “মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারব না? অবশ্যই আমি তার আঙুলের ডগা পর্যন্ত সঠিকভাবে বিন্যস্ত করতে সক্ষম।” (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত ৩-৪)।

​ড. জাভেদ স্তব্ধ হয়ে লেন্সের নিচের রেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে একজনের আঙুলের ছাপ অন্য কারোর সাথে হুবহু মেলে না। স্রষ্টা কেবল হাড় জোড়া দেওয়ার কথা বলেননি, বরং আঙুলের ডগার সেই সূক্ষ্মতম পরিচয়টি পর্যন্ত হুবহু পুনর্নির্মাণ করার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন।
​কালনী নদীর ধারের সেই শান্ত আকাশ হঠাৎ যেন বদলে গেল। ড. জাভেদের মনে হলো ঘরের সব আলো নিভে গেছে এবং বাইরে থেকে এক তীব্র জ্যোতি আছড়ে পড়েছে। তাঁর মনে হলো, তাঁর “চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে” (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত ৭)। সেই অলৌকিক আলোতে তিনি এক কাল্পনিক দৃশ্যে অবগাহন করলেন—দেখলেন, ভেড়াঢহরের দিগন্তজোড়া মাটির প্রতিটি ধূলিকণা আর অস্থিগুলো নিজে থেকেই জোড়া লেগে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব অবয়ব ফিরে পাচ্ছে।
​একই সাথে তাঁর অন্তরে পরবর্তী আয়াতগুলো গুঞ্জরিত হলো: “সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে এবং কী পিছনে রেখে গেছে। বরং মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত ১৩-১৪)। ড. জাভেদ শিউরে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, সেদিন কেবল আঙুলের ছাপই ফিরে আসবে না, বরং তাঁর জীবনের প্রতিটি কাজ এবং প্রতিটি গোপন সত্যও তাঁর সামনে উন্মোচিত হবে। মানুষ শত অজুহাত দিলেও নিজের কাছে সে নিজেই তো বড় সাক্ষী।

ভোরের আজানের শব্দে ড. জাভেদের তন্দ্রা ভাঙল। ল্যাব থেকে বেরিয়ে তিনি শাল্লার মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়ালেন। কালনী নদীর শীতল হাওয়া তাঁর কপালে প্রশান্তি ছুঁয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, প্রতিটি মানুষের আঙুলের ডগায় লুকিয়ে আছে এক একটি মহাবিশ্ব, আর হৃদয়ে গচ্ছিত আছে আমলের এক বিশাল খতিয়ান। একজন কলামিস্ট ও সাংবাদিক হিসেবে তিনি আজ গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন—মানুষের বাহ্যিক রূপ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু স্রষ্টার সেই নিপুণ কারুকাজ আর পরকালের জবাবদিহিতা চিরন্তন।

​লেখকের নোট: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ক্বিয়ামাহ আমাদের অস্তিত্বের সেই চরম সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আধুনিক বিজ্ঞান এখন প্রমাণ করছে। আঙুলের ছাপের মতো অতি ক্ষুদ্র ও অনন্য বিষয়টি দিয়ে মহান আল্লাহ আমাদের পুনরুত্থানের অকাট্য প্রমাণ পেশ করেছেন। একই সাথে এ সূরা মানুষকে তার নৈতিক ও আমলগত দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সজাগ করে।
লেখক পরিচিতি:
হাবিবুর রহমান হাবিব
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা, সুনামগঞ্জ।