
নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করার পর তার দাফন কাফন সম্পূর্ণ হয়েছে। মৃত্যু পরবর্তী আল্লাহ যেন তার সহায় হন সেই দোয়া আমরা করব। তবে মৃত্যু পরবর্তী তার কবরকে ঘিরে কিছু লোক আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকটা অতিরঞ্জিত করছেন যা অনেকেই মনে করেছেন ইসলামিক বিধি-বিধানের পরিপন্থী। সামাজিক মাধ্যম তথা প্রিন্ট মিডিয়ায় উঠে এসেছে এইসব নিয়ে মানুষের ভিন্ন মত।
দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনই অনেকের সাথে প্রাসঙ্গিক আলোচনা হয়। ছোট পরিসরে আমি নিজেও একটু লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত, তাই অনেকে প্রসঙ্গক্রমেআমার কাছে জানতে চেয়েছেন একজন ভদ্র মহিলা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গিয়েছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে, দেশের আপামর জনসাধারণ তাকে যথাযথ সম্মান করেছে এখন মৃত মানুষের কবরকে নিয়ে কেন এত হই উল্লাস? আমি তাদেরকে প্রশ্ন করেছি শুধু প্রয়াত মরহুমা খালেদা জিয়ার কবরকে ঘিরে নয়, প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমান,প্রয়াত জিয়াউর রহমান এর কবরকে ঘিরেও একই উল্লাস চলে আসছে বছরের পর বছর। আমরা যে ভুলগুলো করে আসছি, একই ভুল নিয়ে কাউকে পিন পয়েন্ট করা চলবে না। ভুল গোড়া থেকেই ভুল।
কবরকে কেউ বলছেন কবর আবার কেহ কেহ বলছেন মজার। মজার সম্বোধন করে কবরের উপরে অনেকে জমজমের পানি ছুটছেন, অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে অতিরঞ্জিত কিছু করছেন যা লালসালু উপন্যাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সমালোচনা করে অনেকেই বলছেন এই কবরকে কেন মাজার বলা হয়? যার কারণে আলোচনা সমালোচনার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে।
ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার যথাযথ উত্তর প্রদান অনেক সময় কঠিন। লেখালেখির কারণে আমাকে প্রতিদিনই একটু স্টাডি করতে হয়, যা আমার দৈনিক রুটিনেরই অংশ।
অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস আছে। চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বিষয়টিকে সহজভাবে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা যায় কিনা।
সাধারণত কারো কবরকে ‘মাজার’ বলা যাবে কি না, তা নির্ভর করে আপনি শব্দটি কোন অর্থে এবং কার ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন তার ওপর। শাব্দিক অর্থ মাজার একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ‘পরিদর্শনের স্থান’ বা যে স্থানে মানুষ জিয়ারত করতে যায়। সেই হিসেবে যেকোনো কবরকেই মাজার বলা যেতে পারে, কারণ কবর জিয়ারত বা পরিদর্শন করা হয়।
আমাদের সমাজে প্রচলিত ব্যবহার, বাঙালি সংস্কৃতিতে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সাধারণত কোনো সাধারণ মানুষের কবরকে ‘মাজার’ বলা হয় না। বরং: অলি-আউলিয়া বা বুজুর্গ ব্যক্তি: যারা ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন বা আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে পরিচিত, তাদের কবরকে সম্মানার্থে ‘মাজার’ বলা হয়। সাধারণ মানুষের কবরকে সাধারণত ‘কবর’ বা ‘গোর’ হিসেবেই সম্বোধন করা হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কবরকে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ করা বা সেখানে সিজদা করা, মানত করা বা শিরকপূর্ণ কোনো কাজ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো আল্লাহর ওলির কবরকে সম্মানার্থে মাজার বলায় দোষ নেই, যদি সেখানে ইবাদতের মানসিকতা না থাকে। রাসূল (সা.)-এর শিক্ষা: মহানবী (সা.) কবরকে উঁচুকরণ বা সেখানে ইমারত নির্মাণ করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। তাই কবর যে কারোই হোক, তা যেন লৌকিকতা বা অতিরঞ্জিত রূপ না পায় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
পরিশেষে আবারো, মাজার শব্দটি মূলত একটি পারিভাষিক সম্মানসূচক শব্দ যা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কবরের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ মানুষের কবরকে ‘কবর’ বলাই অধিকতর সঠিক ও স্বাভাবিক। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কবরের নাম কী দেওয়া হচ্ছে তার চেয়ে বরং সেখানে গিয়ে শরিয়তসম্মতভাবে (দুয়া ও জিয়ারত) আচরণ করা হচ্ছে কি না সেটাই মূখ্য বিষয়।
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট
আপনার মতামত লিখুন :