রাজত্ব কেবল তারই


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৮, ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ন /
রাজত্ব কেবল তারই

​গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা। বৃদ্ধ কৃষক লোকমান মিয়া তাঁর জীর্ণ কুঁড়েঘরের বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রমালার মেলা। তিনি বিড়বিড় করে পাঠ করছেন— “তাবা-রাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলকু ওয়া হুওয়া ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন কাদীর” (বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব। তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান)।

​লোকমান মিয়ার জীবনে অনেক ঝড়ঝাপ্টা গেছে। এক সময় তাঁর ভরা সংসার ছিল, জমি-জিরাত ছিল। কিন্তু সর্বনাশা নদীভাঙনে সব বিলীন হয়ে গেছে। আজ তিনি একা, নিঃস্ব। অথচ তাঁর চোখে-মুখে কোনো হাহাকার নেই, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে।

​গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর রহমতুল্লাহ সাহেব সেদিন তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকমানকে এভাবে তসবিহ পাঠ করতে দেখে তিনি একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, “লোকমান ভাই, আল্লাহ তো রাজত্বের কথা বলছেন। কিন্তু আপনার তো আজ থাকার ঘরটাও ঠিক নেই। রাজত্ব বলতে তো এখন আমাদের মতো মানুষদের বোঝায়, যাদের কথায় পুরো গ্রাম চলে।”

​লোকমান মিয়া একটু হাসলেন। শান্ত গলায় বললেন, “রহমত ভাই, আমরা যে রাজত্বের বড়াই করি, তা হলো বালির বাঁধ। আজ আছে, কাল নেই। এই যে আপনি অঢেল সম্পদের মালিক, এক নিমিষেই কি তা ধুলোয় মিশে যেতে পারে না?”

​রহমতুল্লাহ সাহেব উত্তর না দিয়ে গটগট করে চলে গেলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়। তার ঠিক দুদিন পরেই এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রহমতুল্লাহর বড় গুদাম আর আলিশান বাড়ির একাংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যে মানুষটার দাপটে গ্রাম কাঁপত, তিনি আজ রাস্তার মোড়ে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

​খবর পেয়ে লোকমান মিয়া সেখানে গেলেন। রহমতুল্লাহর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ভাই, মন ছোট করবেন না। যাঁর হুকুমে আজ আপনার এই ক্ষতি হয়েছে, তিনি চাইলে মুহূর্তেই আবার আপনাকে সব ফিরিয়ে দিতে পারেন। কারণ, ‘বিয়াদিহিল মুলকু’—রাজত্ব আসলে তাঁরই হাতে। আমরা কেবল আমানতদার মাত্র।”

​রহমতুল্লাহর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, ক্ষমতার দম্ভ করা মানুষের সাজে না। প্রকৃত ক্ষমতার মালিক কেবল একজনই, যিনি এই বিশাল মহাবিশ্ব পরিচালনা করছেন।

​সেই রাতে মসজিদের মিনার থেকে যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল, রহমতুল্লাহ সাহেবও লোকমান মিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে পড়লেন— “ওয়া হুওয়া ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন কাদীর” (নিশ্চয়ই তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান)।

​নীতিকথা: পৃথিবীর ধন-সম্পদ, ক্ষমতা আর দম্ভ সবই ক্ষণস্থায়ী। মানুষের প্রকৃত সাফল্য তার বিত্ত-বৈভবে নয়, বরং মহাবিশ্বের পরম সত্তা মহান আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস এবং তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই নিহিত।

​তথ্যসূত্র: (সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১)

লেখক: হাবিবুর রহমান হাবিব।

শাল্লা, সুনামগঞ্জ।