
লেখক: হাবিবুর রহমান হাবিব
রাহিমা বেগম খুব বেশি বয়স্ক নন, মধ্যবয়সী একজন মার্জিত নারী। পেশায় তিনি একজন স্কুলশিক্ষিকা। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর বারান্দার আরামকেদারাটিতে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বিশেষ করে সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করার সময় তিনি যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে যান। শরতের এক বিকেলে তিনি যখন তিলাওয়াতে মগ্ন, তখন তাঁর দশ বছরের মেয়ে জেরিন এসে পাশে গাল ফুলিয়ে বসল।
জেরিনের মুখভার দেখে রাহিমা বেগম তিলাওয়াত থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে মামনি? মুখটা এমন করে রেখেছ কেন?”
জেরিন অভিমানী স্বরে বলল, “আম্মু, আল্লাহ কি আমাদের সব ইচ্ছা পূরণ করেন না? আমি বাবার কাছে ওই দামি গেমিং কনসোলটা চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবা সরাসরি না করে দিলেন। আমার সব বন্ধুদের আছে, শুধু আমারই নেই!”
রাহিমা বেগম মেয়ের কথা শুনে মৃদু হাসলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় তাঁর নাকের ডগায় থাকা পড়ার চশমাটা পিছলে নিচে পড়ে গেল। চশমা ছাড়া রাহিমা বেগম সবকিছু বেশ ঝাপসা দেখেন। তিনি কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, “জেরিন মামনি, চশমাটা একটু খুঁজে দাও তো মা, আমি তো কিছুই দেখতে পারছি না।”
জেরিন তড়িঘড়ি করে নিচ থেকে চশমাটা কুড়িয়ে এনে মায়ের হাতে দিল। চশমাটা চোখে পরতেই রাহিমা বেগমের ঝাপসা পৃথিবী আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি জেরিনের হাতটা ধরে পরম মমতায় কাছে বসালেন।
”জেরিন, তুমি যে এই চশমা বা কোনো কৃত্রিম লেন্স ছাড়াই বাগানভর্তি ফুল দেখছ, নীল আকাশ দেখছ—এজন্য কি কখনো আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়েছ?”
জেরিন মাথা নিচু করে রইল। রাহিমা বেগম বলতে থাকলেন, “মা, আমরা মনে করি বড় কোনো গাড়ি, দামি খেলনা বা গেমিং কনসোলই বুঝি আল্লাহর একমাত্র নিয়ামত। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখেছ কি? এই যে তোমার ছোট্ট দুটি চোখ, যা দিয়ে তুমি পৃথিবীটা দেখছ; তোমার ফুসফুস, যা তোমার অজান্তেই অনবরত বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নিচ্ছে; এমনকি তোমার জিহ্বা, যা দিয়ে তুমি প্রতিদিন তোমার প্রিয় আইসক্রিমের স্বাদ পাও—এগুলো কি নিয়ামত নয়?”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, “যদি এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহ এই বাতাস বা চোখের আলো কেড়ে নিতেন, তবে পৃথিবীর সব টাকা দিয়েও কি আমরা তা ফিরে পেতাম? এই জন্যই আল্লাহ সূরা আর-রাহমানে বারবার পরম মমতায় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন—’ফাবি-আইয়্যি আ-লা-য়ি রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’। অর্থাৎ, অতএব তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”
মায়ের কথাগুলো জাদুর মতো কাজ করল। জেরিনের চোখের কোণে পানি জমে উঠল। সে বুঝতে পারল, যা সে পায়নি তা নিয়ে অভিযোগ করতে গিয়ে সে তার চারপাশের অগণিত নিয়ামতকে অবজ্ঞা করছিল। সে তার সুস্থ হাত-পা, সুন্দর পরিবার আর এই শান্ত বিকেলের জন্য মনে মনে আল্লাহর কাছে তওবা করল এবং নিচু স্বরে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, হে আল্লাহ! আপনার কোনো নিয়ামতকেই আমি অস্বীকার করি না।”
মূল শিক্ষা:
আমরা যা পাইনি তা নিয়ে আফসোস করতে করতে যা পেয়েছি তার কথা ভুলে যাই। অথচ আমাদের স্বাস্থ্য, প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চারপাশের প্রকৃতিই আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার। কৃতজ্ঞতাই হলো সুখের আসল চাবিকাঠি।
লেখক পরিচিতি:
হাবিবুর রহমান হাবিব
সাংবাদিক
শাল্লা, সুনামগঞ্জ।
আপনার মতামত লিখুন :