
লেখক: সাংবাদিক হাবিবুর রহমান হাবিব
(শাল্লা, সুনামগঞ্জ)
গ্রামের পুরনো কবরস্থানটির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল যুবক রায়হান। তার পরনে দামী পোশাক, চোখে দামী চশমা। শহরে বড় চাকরি করে সে, ব্যস্ততা যেন তার পিছু ছাড়ে না। অনেক বছর পর গ্রামে এসেছে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর দোয়া মাহফিলে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে শহরের অফিসের ফাইলে।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যখন ইমাম সাহেব মাটি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি গম্ভীর কণ্ঠে পাঠ করলেন:
“মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফীহা নুঈদুকুম, ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা।”
রায়হানের কানে শব্দগুলো যেন তীরের মতো বিঁধল। ইমাম সাহেব এর অর্থ বুঝিয়ে বললেন— “আমি এই মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি, এতেই তোমাদের ফিরিয়ে দেব এবং আবার এখান থেকেই তোমাদের বের করে আনব।”
রায়হান নিজের হাতের দিকে তাকাল। যে শরীরে সে এত দামী সুগন্ধি মাখে, যে শরীরকে সে আরাম দিতে দিনরাত পরিশ্রম করে, সেই শরীরটা আসলে সামান্য মাটির তৈরি! পাশেই তার বাবার কবর। একসময় তার বাবাও ছিলেন প্রভাবশালী ও দাপুটে মানুষ। আজ তিনি সেই মাটির নিচেই নিভৃতে শুয়ে আছেন।
হঠাৎ রায়হানের চোখের সামনে থেকে যেন পর্দার আড়াল সরে গেল। সে বুঝতে পারল, মানুষ হিসেবে আমরা যতই উপরে উঠি না কেন, আমাদের শুরুটা এই তুচ্ছ মাটি থেকেই। আর দুনিয়ার সব ব্যস্ততা শেষে আমাদের গন্তব্য হবে এই সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর। মৃত্যুতেই সব শেষ নয়, আবার একদিন এই মাটি থেকেই আমাদের উঠতে হবে হিসেব দেওয়ার জন্য।
তার ভেতরের পুরনো অহংকার আর জাগতিক মোহ মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার সময় রায়হানের মনে হলো, সে যেন নিজের আসল অস্তিত্বের কাছে ফিরে এসেছে। শহর থেকে নিয়ে আসা কৃত্রিম আভিজাত্যের চেয়ে এই মাটির স্পর্শ আজ তাকে বেশি প্রশান্তি দিচ্ছে।
রায়হান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এখন থেকে সে আর মাটির ওপর বুক ফুলিয়ে চলবে না। কারণ, যে মাটি থেকে তার জন্ম, সেই মাটিতেই তাকে ফিরে যেতে হবে, আর একদিন সেই মাটি থেকেই আবার জেগে উঠতে হবে মহান রবের সামনে।
গল্পের শিক্ষা: মানুষের শরীরের উপাদান মাটি, তার শেষ ঠিকানাও মাটি। তাই এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে অহংকার করার কিছু নেই। বরং মাটির মতো বিনয়ী হয়ে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আপনার মতামত লিখুন :