দম্ভের মহাপ্রয়াণ ও এক প্রশান্তির ভোর


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২১, ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন / ০ Views
দম্ভের মহাপ্রয়াণ ও এক প্রশান্তির ভোর

লেখক: সাংবাদিক হাবিবুর রহমান হাবিব (শাল্লা, সুনামগঞ্জ)

​শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে ড. আরহাম ছিলেন এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে তার খ্যাতি ছিল কিংবদন্তীতুল্য। ল্যাবরেটরির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নির্জনতায়, যখন তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রহস্য উন্মোচন করতেন, তার ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে উঠত এক তাচ্ছিল্যের হাসি। এক প্রগাঢ় বিশ্বাস তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল— “মহাবিশ্ব এক বিশাল, নিখুঁত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র; এর কোনো চালক নেই, কোনো স্রষ্টা নেই”। যারা স্রষ্টা বা অলৌকিকতায় বিশ্বাস করত, তাদের তিনি দেখতেন ‘যুক্তিহীন ভাবুক’ হিসেবে, করুণার দৃষ্টিতে।

​একদিন বিকেলবেলায়, আরহামের শৈশবের এক বিস্মৃত অধ্যায় যেন দরজায় কড়া নাড়ল—মাওলানা ইউসুফ। তার সফেদ পোশাকে এক পবিত্র আভা, মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি। আরহাম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হেসেই উঠলেন, অনেকটা শ্লেষের সুরে— “ইউসুফ, তোমরা এখনো সেই আদিম বিশ্বাসের অন্ধকার গুহায় বসে আছো? আমরা যখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা বিশ্লেষণ করছি, তোমরা তখন এক অদৃশ্য সত্তার ইবাদতে কপাল ঘষছো? হাস্যকর!”

​ইউসুফ শান্ত সমুদ্রে ভাসমান এক স্থির নৌকার মতো অবিচল। তার চোখে কোনো বিরক্তি নেই, শুধু গভীর মমতা। তিনি সুমধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত করলেন সূরা আলে-ইমরানের ১৮ নম্বর আয়াতের ঝংকার: “আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; ফেরেশতারা এবং ‘উলুল ইলম’ বা প্রকৃত জ্ঞানীগণও সেই একই সাক্ষ্য দেয়…”

​ইউসুফ তার গভীর দৃষ্টি আরহামের চোখে রেখে বললেন, “আরহাম, মহাবিশ্বের এই সুবিশাল ক্যানভাসে রঙের এমন সুনিপুণ টান কি এমনি এমনি পড়েছে? এই যে গ্যালাক্সিগুলোর ছন্দময় নৃত্য, ব্ল্যাক হোলের রহস্যময় টান—সবই কি এক ‘মহা-পরিকল্পনাকারীর’ স্বাক্ষর নয়? জ্ঞান তো শুধু অহংকার করার জন্য নয়, বন্ধু। জ্ঞান তো সত্যকে চেনার জন্য, নিজেকে জানার জন্য”। আরহাম অবজ্ঞায় জবাব দিলেন, “এসবই নিছক ‘ফিজিক্যাল কনস্ট্যান্ট’, ইউসুফ। গণিতই সব, অলৌকিকতা নয়! বিজ্ঞানই ঈশ্বর”।

​এর কয়েক মাস পর, আরহামের সাজানো জীবনে নেমে এল এক ভয়াবহ কালবৈশাখী। এক বিরল স্নায়ুরোগ তাকে পুরোপুরি শয্যাশায়ী করে ফেলল। যে মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের জটিলতম থিওরিগুলো অবলীলায় সমাধান করত, আজ তা নিজের শরীরকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। হাসপাতালের ভেন্টিলেটরের যান্ত্রিক শব্দের নিচে তার সব পাণ্ডিত্য, তার অহংকার যেন ধুলোয় মিশে গেল। রাতের অন্ধকারে যখন অসহ্য যন্ত্রণা তাকে বিদ্ধ করত, প্রতিটি নিঃশ্বাসে তিনি ভাবতেন— “আমার হাজার কোটি টাকার ল্যাবরেটরি, আমার সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কেন আমাকে এক ফোঁটা প্রশান্তি দিতে পারছে না? কেন বিজ্ঞানের কোনো সূত্রই আমার এই অমোঘ মৃত্যুভয়কে ব্যাখ্যা করতে পারছে না?” তার বিজ্ঞান তাকে চরম অসহায়ত্বের এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিল।

​আত্মসমর্পণের সেই পরম মুহূর্ত

​একদিন গোধূলি বেলায় ইউসুফ এলেন। সূর্যের শেষ রক্তিম আভা জানালার ফাঁক দিয়ে এসে আরহামের ফ্যাকাসে মুখে পড়ল। ইউসুফ পরম মমতায় আরহামের শীর্ণ হাতটি ধরলেন। এবার শোনালেন ১৯ নম্বর আয়াতের নিগূঢ় সত্য— “ইসলাম মানেই হলো আত্মসমর্পণ, আরহাম। মানুষ যখন তার ক্ষুদ্র আমিত্বকে মহান রবের কাছে সঁপে দেয়, তখনই সে প্রকৃত মুক্তির স্বাদ পায়। সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও মানুষ কেবল দম্ভ আর নেতৃত্বের মোহে বিপথে যায়”।

​ইউসুফ ফিসফিস করে বললেন, “বন্ধু, তোমার লড়াই আল্লাহর সাথে ছিল না, ছিল তোমার নিজের অহংকারের সাথে। নিজের তৈরি করা ‘যুক্তির কারাগার’ থেকে বেরিয়ে এসে দেখো, আকাশ কত বিশাল! এই মহাবিশ্ব কত সুশৃঙ্খল! আর সেই শৃঙ্খলা যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তোমার আসল আশ্রয়”।

​আরহামের চোখের সামনে যেন পর্দার পর পর্দা সরতে লাগল। এতদিন অন্ধকারের ওপারে যে আলোকে তিনি অস্বীকার করেছিলেন, আজ সেই আলোই তার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে। তার অর্জিত শত শত ডিগ্রি, তার বৈজ্ঞানিক সম্মাননা—সবই আজ তুচ্ছ কাগজের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। চোখের কোণ দিয়ে ঝরে পড়ল তপ্ত অশ্রু, যা দীর্ঘদিনের জমে থাকা অহংকার আর বিদ্বেষকে ধুয়ে মুছে দিল। রুদ্ধ কণ্ঠে, সমস্ত সত্তা দিয়ে আরহাম বলে উঠলেন: “ইন্নাদ্দীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম” (নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম।)

​ল্যাবরেটরির জাঁকজমক, বৈজ্ঞানিক সাফল্য, কিংবা পার্থিব কোনো অর্জন যা দিতে পারেনি, হাসপাতালের এই সাদা শয্যায় নিঃস্ব হয়ে আরহাম তা খুঁজে পেলেন— এক চিরস্থায়ী প্রশান্তি, যা সব যুক্তি ও বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে।

​উপসংহার:

অহংকার মানুষকে সত্যের সামনে অন্ধ করে রাখে, তাকে একাকীত্বের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। প্রকৃত পাণ্ডিত্য তখনই সার্থক হয়, যখন তা মানুষকে নিজের ক্ষুদ্রতা এবং স্রষ্টার মহানুভবতা উপলব্ধি করতে শেখায়। জয়ী সেই নয় যে তর্কে জিতে যায়, বরং জয়ী সেই— যে সত্যের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।