যাকাত: সাম্য ও সমৃদ্ধির এক ঐশ্বরিক বিধান ​হাবিবুর রহমান হাবিব


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : মার্চ ১৫, ২০২৬, ৮:১০ অপরাহ্ন /
যাকাত: সাম্য ও সমৃদ্ধির এক ঐশ্বরিক বিধান ​হাবিবুর রহমান হাবিব

হাবিবুর রহমান হাবিব
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা, সুনামগঞ্জ

পবিত্র রমজান মাস কেবল আত্মশুদ্ধি আর ইবাদতের মাস নয়, এটি সাম্য ও সহমর্মিতার এক অনন্য পাঠশালা। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে যাকাত অন্যতম, যা মূলত একটি আর্থিক ইবাদত। ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করতে আমরা যেমন ‘ফিতরা’ প্রদান করি, তেমনি সারা বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে ‘যাকাত’ অপরিহার্য।

যাকাত কী ও কেন?

‘যাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। নিজের উপার্জিত হালাল সম্পদ থেকে আল্লাহর নির্ধারিত নির্দিষ্ট অংশ অভাবী মানুষের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার মাধ্যমে অবশিষ্ট সম্পদ যেমন পবিত্র হয়, তেমনি এতে মহান আল্লাহর বরকত বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে বারবার সালাত বা নামাজের পাশাপাশি যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা এর গুরুত্বকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে।

​যাকাতের নেসাব ও হার
যাদের কাছে জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর সঞ্চিত থাকে, তাদের ওপর যাকাত ফরয। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, স্বর্ণের ক্ষেত্রে ৭.৫ তোলা (ভরি) অথবা রুপার ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা (ভরি) পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত প্রদান করতে হয়। স্বর্ণ বা রুপার যেকোনো একটির সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য থাকলেও যাকাত ফরয হয়। মোট সঞ্চিত সম্পদের ওপর ২.৫% বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হয়।

​যাকাত আদায়ের নির্ধারিত খাতসমূহ
যাকাত ইচ্ছেমতো যেকোনো খাতে ব্যয় করার সুযোগ নেই। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাত ব্যয়ের ৮টি সুনির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ফকির, মিসকিন, নিঃস্ব, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এবং বিপদগ্রস্ত মুসাফির অন্যতম। যাকাত কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং এটি ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার বা ‘হক’।

​সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
যাকাত সম্পদকে সমাজের গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হতে বাধা দেয়। দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের চেয়ে কার্যকর ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। যদি সমাজের সামর্থ্যবান প্রতিটি মানুষ সঠিকভাবে যাকাত আদায় করত, তবে সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি ও চরম অভাব চিরতরে দূর হয়ে যেত।

[বক্স আইটেম: একনজরে যাকাত ক্যালকুলেটর]
মোট সঞ্চিত নগদ টাকা + স্বর্ণ ও রুপার বাজার মূল্য + ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য — (মাইনাস) ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ঋণ = যাকাতযোগ্য নিট সম্পদ। এই নিট সম্পদের ওপর ২.৫% হারে যাকাত আদায় করুন।

উপসংহার
আসুন, এই পবিত্র রমজানে আমরা আমাদের সারা বছরের জমানো সম্পদের সঠিক হিসাব করি। লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং দুস্থ মানবতার কল্যাণে যাকাত আদায় করি। আপনার সামান্য ২.৫% অর্থ হয়তো কোনো অভাবী পরিবারের মুখে সারা বছরের হাসি ফোটাতে পারে। সমাজ থেকে অভাব দূর করতে যাকাত হোক আমাদের অঙ্গীকার।