
নুরুজ্জামান ফারুকী হবিগঞ্জ থেকে ॥
হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের মূল ফটকে বড় করে লেখা “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ।” কিন্তু বন্দিদের মুখে শোনা বাস্তবতা ঠিক উল্টো। একেকজন বন্দি যখন কারামুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের চোখেমুখে ঝুলে থাকে ভয়ের ছাপ, ভেতরের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার ভার; যেন ইঙ্গিত দেয় সেই আলো নামের পথ প্রকৃতপক্ষে কতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের ভেতরে জমে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির চোরাবালিতে বন্দিদের জীবনযাপন একেকটি যন্ত্রণাময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বন্দিদের বরাদ্দকৃত খাবারের মান নিয়ে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম। সরকার যেভাবে নিয়মিত বরাদ্দ দেয়, তা ঠিকমতো ব্যয় না করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। খাবারের মান এতটাই নিম্নমানের যে অনেক সময় তা খাওয়ারও অনুপযোগী থাকে। অথচ এই নিন্মমানের খাবারের জন্যই অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়, যেন কারাগারের ভেতরেও টাকার বিনিময়ে ন্যায্য খাবার পাওয়াটা একটি ‘সুবিধা’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এক বন্দি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিনের খাবার নিয়ে বন্দিদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও মুখ খুলে বলার সাহস কারও নেই। কারণ অভিযোগ করলেই তাদের উপর বাড়তি চাপ, অপমান কিংবা বিভিন্নভাবে হয়রানির শঙ্কা থাকে। তার ভাষায়, “ভালো খাবার আমরা পাইনি কখনো। খাবারের বরাদ্দ কোথায় যায়, সেটা সবারই জানা, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারে না। ভিতরে কিছু বললে বিপদ।” শুধু খাবার নয়, কারাগারের ভেতরে আরেকটি দীর্ঘদিনের ক্যানসারের মতো সমস্যা হলো ‘সিট বাণিজ্য’। নতুন কোনো বন্দি কারাগারে প্রবেশ করলেই শুরু হয় তাকে ঘিরে নানা দালালদের ঘেরাও। ফাইল পাহারাদারদের একটি প্রভাবশালী অংশ নতুন বন্দিকে ‘ভালো সিটে’ নেওয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। কারাগারের ভেতরে সিট মানেই অপেক্ষাকৃত ভালো পরিবেশ, কম ভিড়, একটু সুবিধা, কিছুটা স্বস্তি। আর এই স্বস্তির মূল্য হিসেবে দিতে হয় চড়া অর্থ। পূর্বের এক বন্দির কথায় জানা যায়, “কারাগারে টাকার ক্ষমতা সবকিছু নির্ধারণ করে। যার কাছে টাকা আছে, তার জন্য কারাগার তুলনামূলকভাবে সহনশীল। আর যার নেই, তার জন্য প্রতিটি দিন একেকটি যুদ্ধ।”
কারাগারের ভেতরে থাকা এই অদৃশ্য দুর্নীতির নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে, সবাই জানলেও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পায় না। পরিবারের সদস্যরাও একই ভয়ে থাকে। অনেক পরিবার অভিযোগ করেছেন, তারা নিয়মিত টাকা না পাঠালে ভেতরে থাকা প্রিয়জনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। বাজার-সদাই থেকে শুরু করে চিকিৎসা সেবা, সব েেত্রই অতিরিক্ত খরচের বোঝা বইতে হয় পরিবারগুলোর। যেন কারাগার একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে ‘চালানো’ একটি ব্যবসা। স্বজনরা দেখা শেষে বন্দিদের কাছে খরচ বাবদ কোনো টাকা দিতে হয় তাহলে শতকরা ২০ টাকা করে নিয়ে যান কতিপয় কারারক্ষীরা। এ ছাড়া জেল কোডের আইন হচ্ছে সপ্তাহে একদিন বন্দিরা স্বজনদের সাথে মোবাইলে কথা বলতে পারবেন এবং ১৫ দিন পর দেখা করতে পারেন। কিন্তু টাকা দিলে নিয়ম বদলে সবকিছুই চলে এই কারাগারে। সর্বশেষে বলা যায়, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের বাস্তবতা কারা-ব্যবস্থার দুর্বলতার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে বন্দিদের মানবিক অধিকার যেখানে উপেক্ষিত, সেখানে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের কথা বলা যেন ঠাট্টারই সমান। কারাগারের স্লোগান হয়তো বাইরে ঝুলে আছে, কিন্তু ভেতরের সত্য তা থেকে অনেক দূরে।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি, শুধুমাত্র তদন্ত নয়, বরং সত্যিকারের সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই পারে কারাগারের অন্ধকার সরিয়ে সামান্য হলেও আলোর পথ দেখাতে। জেল সুপার এ বিষয়ে জানান, অভিযোগ মিথ্যা। যদি কোনো কারারক্ষী এমন করে তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :