
মাহবুবুল আলম
নেয়ামত আলী ছিল দুলারচর গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তাদের জমিজমাও ছিল বেশ। গ্রামের বাজারে শাড়ি কাপড়ের ব্যবসা করে ভালই চলছিল তাদের। নেয়ামত আলী ছিল ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড়। এই ব্যবসার আয় রোজগারেই পিতৃহারা ভাই-বোনদের মানুষ করতে হয়েছে তাকে। শেষে নিজেও বিয়ে করেন পাশের গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ধীরে ধীরে সংসারও বড় হতে থাকে। একদিন ভাইয়েরাও আলাদা হয়ে যায়। কিছু জমি বিক্রি করে ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন নয় বলে গ্রামের বিভিন্ন ব্যাবসায় মার খেয়ে নেয়ামত আলী ভাগ্যেন্নষণে ঢাকা চলে আসে। ঢাকা এসে এতজন মানুষ নিয়ে নেয়ামত আলী যেন অথৈ সাগরে পড়ে। কোথাও তেমন কাজ যোগার করতে না পেরে জীবনে যে কাজ কখনো করেনি সে ধরনের কাজই তাকে করতে হয়েছে কত দিন। থাকতে হয়েছে বস্তিতে। সে এক অবর্ণনীয় জীবনের কথা মনে হলে অজানিত যন্ত্রনায় কেমন কুকড়ে ওঠে নেয়ামত আলীর স্ত্রী তনিমা বেগম। এভাবে চলতে থাকে অনেক বছর। শত কষ্টের মধ্যেও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন তনিমা বেগম।
স্বামীর এত কষ্ট দেখে নেয়ামত আলীর স্ত্রী তার বাবার বাড়ি থেকে দশ হাজার টাকা এনে একটা ফলমূলের ব্যবসায় লাগান স্বামীকে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা বস্তি ছেড়ে শহরতলীতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে মোটামুটিভাবে দিনতিপাত করছিলেন। ছেলে-মেয়েরাও লেখাপড়া করে এগিয়ে যেতে থাকে। নেয়ামত আলী এলাকার ব্যবসায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসাও তেমন এগোয় না। আস্তে আস্তে পূঁজিতে হাত পড়তে থাকে। নেয়ামত আলীও ঠিক আগের মতো কাজ করতে পরে না। তাই তনিমা বেগম সেলাই ফোঁড়াইয়ের কাজ শুরু করেন। মেয়েদের নিয়ে এটা সেটা বানিয়ে কিছু আয় রোজগার হলে সংসারের কাজে লাগে। এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ করেই বড় ছেলে সাজিদের কারণে তাদের পরিবারে নেমে আসে না অশান্তি।
রাত প্রায় সাড়ে বারটা বাজে। এখনও ছেলেটা ফিরল বাসায় ফিরল না। আজকাল যা দিনকাল পড়েছে কোথাও কারো যেনো নিরাপত্তা নেই। সরকার হটানোর জন্য বিরোধীদলের টানা অবরোধ চলছে। যখন তখন বাসে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। বোমা হামলায় কে কখন লাশ হয় তার কোন ঠিক নেই। তাই ছেলের জন্য তনিমা বেগমের মন অস্থির হয়ে আছে। দুইদিন আগে তাদের মহল্লার একটা তরতাজা প্রাণ হারালো। তাই সাজিদ যতক্ষণ পর্যন্ত সাজিদ বাসায় না ফিরে ততক্ষণ পর্যন্ত যেন তানিমা বেগমের চিন্তার অন্ত থাকে না। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত সাজিদ বাসায় না ফিরে ততক্ষণ পর্যন্ত তনিমা বেগম জেগে থাকেন।
টিউশনী থেকে ফিরে দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে দেন মা তনিমা বেগম। কপাট ঠেলে বাসায় ঢুকে সাজিদ। তনিমা বেগম ম্লানসুরে জিজ্ঞেস করেন-
: কিরে সাজিদ এতক্ষণে এলি। তোর পড়ানোতো শেষ হয়ে গেছে সেই কখন। অন্য কোথাও গিয়েছিলে বুঝি?
সাজিদ ভাল মন্দ কিছুই না বলে চলে যায় নিজের রুমে। ছেলের কোন উত্তর না পেয়ে তনিমা বেগম হতাশ হন। আজকাল সাজিদ কেমন যেন অন্যরকম ব্যবহার করছে। যা সাজিদের আগের ব্যবহারের সাথে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। আগে বাসায় ফিরেই সবার সাথে আলাপ করে খাওয়া-দাওয়া করে নিজের ঘরে ঢুকতো। মা-বাবার প্রতি ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ভাইবোনদের প্রতি প্রতি ছিল ভীষণ মমতাশীল। যা আজকালের ব্যবহারের সাথে কিছুতেই মেলাতে পারছে না তনিমা বেগম। আজকাল সবসময় যেন সবার কাছে থেকে কী যেন লুকাতে চায়, কেমন একধরণের পলায়নপর অবস্থা তার মধ্যে। আগে যে ছেলে প্রতিদিন না হলেও দু’একদিন পর পর সেভ করতো। এখন তার মুখভর্তি দাড়ি, এদিকে যেন কোন খেয়ালই নেই সাজিদের। সবসময় যেন কেমন এক ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকে সাজিদ। এ নিয়ে তনিমা বেগমের চোখেমুখে কেমন চিন্তার ভাব ফুটে ওঠে।
সাজিদ রুমে ঢুকেই হাতমুখ না ধুয়ে নিজের ঘরের তালা খুলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তনিমা বেগম কী যেন ভেবে সাজিদের ঘরের দিকে উঁকি মারেন। দেখেন ছেলে অনেক লিফলেট গোছাচ্ছে। ব্যাগ থেকে কী যেন নামিয়ে রেখে দিল খাটের নিচে। এরপর ছোট ছোট কিছু বই গুছিয়ে রাখে টেবিলের ওপর। আগে সাজিদ তার ঘরে তালা দিয়ে রাখতো না। এখন প্রতিদিন বাইরে যেতেই তার রুম তালাবদ্ব করে রেখে যায়। বাসায় এসেও ভাই-বোন কাউকেই তার রুমে ঢুকতে দেয় না। কেউ যদি কখনো তার রুমে ঢুকে মেজাজ খারাপ করে রুম থেকে বের করে দেয়।
বেশ কয়েক মাস যাবতই তনিমা বেগম লক্ষ্য করছে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রতিদিনই দেরি করে। আর ফেরার পথে একগাদা লিফলেট ও ছোট ছোট বই নিয়ে আসে। আজও অনেক লিফলেট ও ছোট ছোট কিছু বই নিয়ে এসেছে সাজিদ। মায়ের নড়াচড়ার আওয়াজ পেয়েই সাজিদ যেন কেমন আত্কে ওঠে। সে অনেকটা বিরক্তির সাথে বলে-
: তুমি এখানে কি কর। আমিতো আসছি, নাকি?
: না রাত তো বেশ হলো তাড়াতাড়ি খাবি কি না তা জানতে এলাম।
: না আমি কিছুই খাব না। তুমি এখন যাও। আমার এখন কাজ আছে।
: কাজ আছে তো ভাল করে বললেই তো হতো, মেজাজ খারাপ করে করে বলার কি আছে। তা ছাড়া বাইরে থেকে খেয়ে আসবি সে কথা মোবাইলে জানালেই তো হতো, তা হলে এত রাত পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করে থাকতে হতো না।
: জানানোর কি আছে! আর আমি তো তোমাকে আমার জন্য অপেক্ষা করতে বলিনি। এখন থেকে আমার খাবার ঢেকে রেখে দিও আমি এসে আমার মতো খেয়ে নেবো।
তনিমা বেগম আর কথা না বাড়িয়ে সাজিদের ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তনিমা বেগম আরও কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু ছেলের এমন তিরিক্ষি মেজাজ দেখে আর কিছুই বলেননি। তাই আস্তে আস্তে এসে রান্না ঘরে ঢুকে আলো জ্বালায়। বাসার সবাই ঘুমিয়ে গেলেও ছেলের অপেক্ষা করে একমাত্র জেগেছিলেন তনিমা বেগম। কিন্তু ছেলের মেজাজ দেখে নিজের মেজাজটা বিগড়ে গেছে হঠাৎ করেই। মা-বাবা অন্তঃপ্রাণ সাজিদ হঠাৎ করেই যেন কেমন বদলে যাচ্ছে। কথায় কথায় আজকাল কেমন মেজাজ করে। তা হলে কি ছেলে কোনো বিপথে চলে গেছে, এমন প্রশ্ন এসে জড়ো হয় তনিমা বেগমের মনে। কিন্তু সংসারের হাজার সমস্যা অভাব অনটনের চাপে প্রশ্নটি চাপা পড়ে থাকে।
ঢাকার বুকে সাত সদস্যের একটি সংসার কোনো রকমে টেনেটোনে চলছে। রোজগার বলতে শহরতলীতে ফুটপাতে ফলমূলের ব্যবসা সাজিদের বাবা নেয়ামত আলীর। পূঁজি-বাট্টাও তেমন নেই। এখন ব্যবসার পূঁজি চার পাঁচ হাজার টাকায় এসে ঠেকেছে। কিন্তু তার বয়স যতই বাড়ছে ততই যেন ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ছে সে। তার ওপর আছে হরতাল অবোরোধ রাজনৈতিক না ক্যাচাল। তাই মাসের বেশ কিছু দিন তেমন ব্যবসা হয় না। পেটতো আর হরতাল ধর্মঘট কিছু বুঝেনা। তাই সে সময় ঘরের ক্ষুদার্থদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য নেয়ামত আলীকে বাধ্য হয়ে ধার-কর্য করে চলতে হয়।
এভাবে কর্য পরিশোধ করতে করতে ব্যবসার পূঁজি প্রায় নাই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাই তনিমা বেগমের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বড় মেয়ে দুইটা সেই কবেই বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে হয়েছে, ছোট দুই ছেলে এক মেয়ে স্কুলে পড়ে। স্কুলের টিউশন ফি সময় মতো দিতে পারে না বলে প্রায়ই ভর্তিখাতায় এদের নাম কাটা যায়। বড় মেয়েটা থাকাতে তাদের পরিবারের অনেক কাজে এসেছে। রাশিদা একটা এনজিও স্কুলে চাকুরী করে বিকালে আরো দুইটা টিউশনী করে মাসে পরিবারকে তিন হাজার টাকার মতো দিতে পারে। তাই রক্ষা। মেয়েটা না হলে যে কি হতো তা ভেবেই দুশ্চিন্তার অন্ত নেই তনিমা বেগমের।
তবু মাঝে মাঝেই বাড়িভাড়া বাকি পড়ে যায়। তবে বাড়িওয়ালীর সাথে সুসম্পর্কের কারণে দু-একমাস পর পরও ভাড়া দিলে তেমন কিছু বলে না। দীর্ঘদিন থেকেই তারা এ বাড়িতে থাকে। প্রথম যখন এ বাড়িতে ঢুকে তখন এর ভাড়া ছিল গ্যাস বিলসহ বারশ’ টাকা। পনের বছরে বাসাভাড়া বেড়ে হয়েছে ছয় হাজার। তাই এ বাসায় থাকা তাদের জন্য অনেকটাই বোঝা। তা ছাড়া শহরতলীর এ বাড়িটির ভাড়াও কিন্তু আশ-পাশের বাড়ির চেয়ে কম। তিন বেডরুমের এমন একটা বাসা আশে-পাশেই সাত-সাড়েসাত হাজারের কমে পাওয়া যাবে না। আজকাল একটু ভাল বস্তিতেও তিন সাড়ে তিনের নিচে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। তাই খুব কষ্ট হলেও কখনো ভরপেট কখনো আধাপেট খেয়ে হলেও এ বাড়িতে থাকতে হচ্ছে তাদের।
চরম দারিদ্রের মাঝে বেড়ে ওঠা সুদর্শন মেধাবী যুবক সাজিদ। কম লেখাপড়া জানা, গরীব মা-বাবার ঘরে এ যেন ‘গোবরে পদ্মফুল’। পিএসসি, জেএসসি এবং এসএসি পরীক্ষায় সে এ-প্লাস পেয়েছে এইচএসসিতে অল্প কয়েক পয়েন্টের জন্য এ-প্লাস মিস হয়েছে। তাই সাজিদের মা-বাবা ছেলেকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনে- একদিন ছেলে বড় পাস দিয়ে বড় চাকুরী করে ঘুরিয়ে দেবে তাদের ভাগ্যের চাকা। বাকি ভাই-বোনদেরও মানুষ করবে সাজিদ; তখন শুধু সুখ আর সুখ।
এইচএসসি পাশের পর সাজিদ দেশের শীর্ষস্থানীয় এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী ও ইসলামী সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হয়। মা-বাবার স্বপ্নের ভিত্ আরো মজবুত হয়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছেলে ধর্ম-কর্মে মন দিয়েছে। মুখ ভরা দাড়ি রেখেছে। দাড়ি যেন ছেলেকে আরো সুদর্শন করে তুলেছে। বেশ খুশিই হয় তনিমা বেগম ও নেয়ামত আলী। কিন্তু বিপত্তি বাধে তখনই যখন মা-বোনদেরকে বেগানা এমন কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মীয় পুরুষদের সামনে যেতেও বাঁধা প্রদান। বোরকা ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে চাপ প্রদানসহ বেশি রকম বাড়াবাড়ি তনিমা বেগমের মনকে সন্দেহের ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে দিতে থাকে। সাজিদের এসব কর্মকান্ডে পরিবারে এক ধরণের অশান্তি বিরাজ করে। ঠিকমত হিজাব না পরালে এবাড়িতে বোনদের জায়গা হবে না বলে দিয়েছে সাজিদ। ঘরে একটা সাদাকালো টেলিভিশন ছিল তা ও সাজিদ বিক্রি করে দিয়েছে।
ধীরে ধীরে এভাবেই তাদের স্বপ্নের ঘরে ফাটল দেখা দেয়। লেখা পড়ায় সাজিদের আগের মতো মন নেই। বাইরে কিসব পার্টি-টার্টি যেন করে বেড়ায়। তাদের বাড়িওয়ালীই একদিন কথায় কথায় তনিমা বেগমকে বলেন-
: আপা, যদি কিছু মনে না করেন, তাইলে আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। বাড়িওয়ালীর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তনিমা বেগম বলেছিল-
: না না আপা বলেন বলেন।
বাড়িওয়ালী কিছুটা আমতা আমতা করে বলে-
: আপা আমার সাহেব কিছুদিন আগে আমায় বলেছিল কথাটা, কিন্তু ঝামেলায় ঝামেলায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তাই এতদিন বলা হয়নি। তাছাড়া কথাটা বললে আপনি আবার কীভাবে নেন এই ভেবেই আর এতদিন আপনাকে কথাটা বলা হয়ে ওঠেনি। বাড়িওয়ালীর কথায় চেহারায় বেশ চিন্তার ভাঁজ ফুটে ওঠে।
নিজের এ অবস্থা গোপন করার চেষ্টা করে তনিমা বেগম বলেছিল-
: আপা কি হয়েছে বলেনতো।
বাড়িওয়ালী কিছুটা আশ্বস্থ করার মতো করে বলেছিলেন-
: আমার সাহেব সেদিন বলেছিল যে সাজিদ নাকি পাড়ার যেসব ছেলেদের সাথে চলাফেরা করে এরা নাকি ভাল না। কোন উগ্রবাদী দল করে। বোমাটোমা ফাটায়, ধর্ম ব্যবসা করে। এরা নাকি সবাই ইসলামী উগ্রপন্থী দলের লোক। তাই সে বলেছিল তুমিতো সাজিদের মায়ের সাথে ওঠাবসা করো; ওনাকে বলে দিও ছেলের প্রতি খেয়াল রাখতে। ওইসব ছেলেদের সাথে যারা মিশে তারা ওই দলের লোক না হয়ে পারে না।
বাড়িওয়ালীর কাছ থেকে এসব কথা শোনার পর তনিমা বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। হঠাৎই কেমন যেন এক অচেনা আঁধার তনিমা বেগমের চেনা জগতটাকে কালোমেঘে ঢেকে যায়। তার মাথা ঘুরাতে থাকে। শরীরটা খারাপ লাগছে বলে বাড়িওয়ালীর বাসা থেকে তনিমা বেগম বেরিয়ে এসেছিল। রাতে বাবা ঘরে ফিরলে তনিমা বেগম স্বামীকে কথাটা বলেন। নেয়ামত আলী কথাটা শোনে কেমন বিমর্ষ হয়ে যান। এটা ভেবে রাতের খাবার অর্ধেক খেয়েই ওঠে যান।
সেদিন থেকেই একটা সন্দেহের ইঁদুর তনিমা বেগমের মনে বাসা বাঁধে। এ ইঁদুর যখন-তখনই মনের ভেতর খঁচখঁচ আওয়াজ করে। তাই একদিন সাজিদের অনুপস্থিতিতে সাজিদের রুমের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রুমে ঢুকে কিছু পুস্তিকা ও লিফলেট দেখতে পেয়ে বাড়িওয়ালীর কথাটা আরো প্রবলভাবে তনিমা বেগমের কানে বাজতে থাকে। এর পর থেকেই তনিমা বেগম ছেলের ওপর নজর রাখতে থাকেন। সাজিদের মতিগতি তার কাছে ভাল ঠেকছে না। জীবনযাত্রায় সকল নিয়মই যেন তার অনিয়মে পরিনত হয়। মা ভাল কথা বললে ও উত্তেজিত হয়ে যায়, কেমন খেট খেট করে। স্কুল কলেজ জীবনে যে ছেলে ছিল ভদ্রনম্র স্বভাবের । মা-বাবা বা মুরব্বিদের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকাতো না সেই ছেলেকে এখন চেনা যাচ্ছে না। মা-বাবার সাথে রূঢ় ব্যবহার করে। অকারেণে ছোট ভাই-বোনদের গায়ে হাত তোলে মারধর করে।
এভাবেই এক বছর না ঘুরতেই তানিমা বেগমের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত হতে থাকে। তখন থেকেই, দুঃস্বপ্নের এক রহস্যময় আঁধার তার জীবনকে অদৃশ্য এক কালো চাদরে ঢেকে দিতে থাকে। আর সেই কালো চাদরের যোগান দেন তাদের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. নোমান হাশমী। তিনি তাকে দেখান এক নিষিদ্ধ স্বপ্ন। কিন্তু প্রথম প্রথম সাজিদ আমলে নেয়না এসব। কিন্তু পরবর্তীতে দেশে নিজেদের হুকুমত কায়েমের পথিকৃৎ এই শিক্ষক সাজিদকে ম্যাসমেনিজম করে ভিরিয়ে ফেলেন নিজেদের দলে। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদের মতবাদের হুকুমত কায়েম করতে পারলে পরকালে লাভ করা যাবে সর্বোচ্চ জান্নাত; এ মতবাদ প্রচার করে ভিরিয়ে ফেলেন সাজিদের মতো এমন আরও মেধাবী ছাত্রকে। তবে অচিরেই নিজ মেধা ও নেতৃত্বগুণে সবাইকে টেক্কা দিয়ে সাজিদ পরিনত হয় এক দুর্ধর্ষ ক্যাডারে। সে হয়ে ওঠে সবার বড় ভাই। সেই শিক্ষকই অন্য একজন সিনিয়র এর সহযোগিতায় বোমা, পাইপগান হালকা অস্ত্র তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে এক দুর্ধর্ষ ক্যাডারে পরিনত করে। সে তার অনুসারিদের দিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে বোমাহামলার ঘটনা ঘটাতে থাকে। এতে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি দেখে সাজিদের মনে অনুশোচনা শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর মিথিলা নামের ধনী পরিবারের এক সুন্দরী মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা দুজন প্রজাপতির ডানায় ভর করে জীবন সাজানো স্বপ্নে বিভোর হয়। একদিন মিথিলা বুঝতে পারে সাজিদ কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। সে তার ব্যাচমেটদের কাছে খবর নিয়ে জানতে পারে সাজিদ একটা ইসলামী উগ্রপন্থী দলের হয়ে কাজ করছে। এরপর থেকে নানান কৌশলে মিথিলা সাজিদকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে। সাজিদও ঠিকই বুঝতে পারে এটা তার সঠিক পথ ও সঠিক কাজ নয়। সে পথ থেকে সাজিদ ফিরতে চায়, কিন্তু ফিরতে পারে না। তারা যে অন্ধকার গুহায় ঢুকেছে সেটাতে একটি মাত্র রাস্তা আর সে রাস্তাটি হলো ঢোকার ফেরার কোন রাস্তা নেই সেখানে। আর একান্ত ফিরতে হলে যে জীবন দিতে হবে বন্ধু বা সহকর্মীদের হাতেই। এমন কয়েকটি নৃশংস ঘটনা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করে শিউরে ওঠে। কিন্তু সে যদি এ পথ থেকে ফিরে আসে তাহলে অন্যদের মতো তাকেও যে প্রাণ হারাতে হবে। এভাবেই এক মেধাবী ছাত্র হুকমতী দলের জেহাদী কর্মকান্ডে ব্যস্ত থেকে লেখাপড়ায় চরম অবনতি ঘটায়। পরীক্ষায় ফেল করে। রাষ্ট্রবিরোধী অপকর্মের জন্য কয়েকবার গ্রেফতার হয়। জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। তার এই ভুল পথের যাত্রা থেকে ফেরাতে না পেরে ভালোবাসার মেয়ে মিথিলাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। সাজিদ তার ভালোবাসার মানুষ মিথিলাকে নারী স্কোয়ার্ডের সদস্য বানাতে ব্যর্থ হয়। মিথিলা সাজিদকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত সে সাজিদকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর সাজিদ হতাশায় নিমজ্জিত হতে হতে তলিয়ে যেতে থাকে নরকের অতলে।
একদিন সাজিদ নিজের সব স্বাদ, আহ্বলাদ ও স্বপ্ন কবরচাপা দিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্রনেতা হিসেবে ঝাপিয়ে পড়ে। তার হাতে দেয়া হয়ে রাজধানীকে অচল করে দেয়ার দায়িত্ব। সে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দলের ক্যাডারদের সংগঠিত করে একযোগে বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলার নেতৃত্ব দেয়। ঢাকা অবরোধ আন্দোলনে পুলিশ ক্যাম্পে বোমা হামলা দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে রমনা পুলিশ ক্যাম্পে ওপর বোমা নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে পকেটে হাত ঢুকাতেই বোমাটি পকেটেই বিস্ফোরিত হয়। এতে সাজিদের নিন্মাঙ্গ সম্পূর্ণ উড়ে যায়।
পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা শেষে তাকে কারাঘারে নিক্ষেপ স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসার এক পর্যায়ে তার দুই পায়ের উরু পর্যন্ত কেটে বাদ দিতে হয়। দুই বছর কেইস চলার পর অস্ত্র আইনে তার সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়ে। তিন বছর কারাদন্ড ভোগ করার পর মানবিক কারণে উচ্চাদালতে তার জামিন হয়।
এরপর সাজিদ পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে অনিশ্চিত এক জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তার সেই রাজনৈতিক দলও আর তার খোঁজ করে না। যে সাজিদকে নিয়ে মা-বাবা রঙিন স্বপ্ন সাজিয়েছিল সে স্বপ্নও তাদের ধূসর হয়ে যায়। সাজিদ এখন আর মা-বার স্বপ্ন নয়, ভীষণ ভারি অবহনযোগ্য এক বিশাল বোঝায় পরিনত হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :