
হাবিবুর রহমান হাবিব, শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
একটি কথা এ অঞ্চলে প্রবাদের মতো প্রচলিত—”রাজনীতি যদি শিখতে চাও, তবে দিরাই-শাল্লায় যাও।” জাতীয় রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত কমরেড বরুণ রায়, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ এবং সংসদীয় রাজনীতির কিংবদন্তি প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এই পুণ্যভূমি এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মোড় প্রত্যক্ষ করছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এ আসনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও তাঁর পরিবারের যে একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, এবারের প্রেক্ষাপট তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সুরঞ্জিত-পত্নী ড. জয়া সেনগুপ্তা এবার নির্বাচনী ময়দানে নেই। ফলে দীর্ঘদিনের ‘সেন দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এই জনপদে রাজনীতির সমীকরণ এখন উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
প্রবীণ বনাম নবীনের লড়াই
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে এবার মূল লড়াই আবর্তিত হচ্ছে বিএনপির পোড়খাওয়া নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী এবং তারুণ্যের প্রতিনিধি, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরকে ঘিরে।
নাছির উদ্দিন চৌধুরী (ধানের শীষ): তৃণমূলের সাথে তাঁর রয়েছে গভীর নাড়ির টান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে তৎকালীন হেভিওয়েট প্রার্থী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হারিয়ে সারা দেশে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। অভিজ্ঞতার ঝুলি এবং বিএনপির সুসংগঠিত ভোটব্যাংক তাঁর প্রধান শক্তি।
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির (দাঁড়িপাল্লা): সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী তরুণ প্রজন্মের কাছে এক নতুন আশার নাম। তিনি ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছেন। তবে জামায়াত মনোনীত এই প্রার্থীর জন্য প্রবীণ এবং হিন্দু ভোটারদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করাই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মাঠে আছেন বামপন্থী খোকন
বড় দুই প্রার্থীর লড়াইয়ের পাশাপাশি নির্বাচনী মাঠে আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সরব রয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী অ্যাডভোকেট নিরঞ্জন দাস খোকন। ‘কাস্তে’ প্রতীক নিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। বড় দুই জোটের মাঝে তাঁর উপস্থিতি নির্বাচনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
ভোটের সমীকরণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার ৩,০৬,০৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৫৪,৬৫২ জন এবং নারী ভোটার ১,৫১,৩৯৯ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ আসনে প্রায় ৩৫% থেকে ৩৮% হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার রয়েছেন।
দিরাই-শাল্লার ইতিহাস চিরকালই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। তবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো শক্তিশালী অভিভাবকের অবর্তমানে সংখ্যালঘু ভোটারদের মনে একটিই বড় প্রশ্ন—আগামীতে যিনিই ক্ষমতায় আসুক, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ কি সমান নিরাপদ থাকবে?
শেষ হাসি কার?
মাঠ পর্যায়ের ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা শুধু একজন নেতা নন, বরং একজন যোগ্য ‘কাণ্ডারি’ খুঁজছেন—যিনি হাওরপারের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা গভীরভাবে উপলব্ধি করবেন। অভিজ্ঞতার জয় হবে নাকি পরিবর্তনের জোয়ারে নবীনের অভিষেক ঘটবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। তবে সব ছাপিয়ে দিরাই-শাল্লাবাসী চায় এমন এক নেতৃত্ব, যার হাতে অটুট থাকবে এই জনপদের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
আপনার মতামত লিখুন :