বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইন্ডিয়ার নাক গলানো বুমেরাং হবে


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৩০, ২০২৪, ১২:৪১ অপরাহ্ন /
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইন্ডিয়ার নাক গলানো বুমেরাং হবে

মুহাম্মদ আবদুর রহীম চৌধুরী

হিন্দু সম্প্রদায় আওয়ামীলীগ দ্বারা বেশী অত্যাচারিত আবার সুবিধাপ্রাপ্তও বটে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে এই পর্যন্ত হিন্দুদের জায়গা-জমি সম্পত্তির ৯০ ভাগের অধিক আওয়ামীলীগরাই অবৈধভাবে দখল করে নেয়। তাদের সম্পত্তি অবৈধ দখল কিংবা কম দামে কিংবা নামেমাত্র দামে আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্রয় করে অনেককে ইন্ডিয়া যেতে তথা দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। আবার কিছু হিন্দু নিজেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইন্ডিয়ায় সেটেল হচ্ছেন।

হিন্দুদের মন্দিরের জায়গা দখলসহ সবচেয়ে বেশী ক্ষতি আওয়ামীলীগই করে – এরকম বক্তব্য হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রানাদাশ গুপ্তও একাধিকবার দিয়েছেন।

ইন্ডিয়াতে মুসলিমরা ১৪% হলেও চাকরীতে ১% এর নিচে৷ অন্যদিকে বাংলাদেশে হিন্দু ভাইয়েরা ৭% হলেও চাকরীতে প্রায় ২০% এর উপরে।

যোগ্য হলে বাংলাদেশের সব জায়গায় প্রশাসনে হিন্দুরা নিয়োগ পেলে তথা কোনো মুসলিম নিয়োগ না পেলেও আমার আপত্তি নেই। দেশের স্বার্থে যোগ্যতাকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। দেশকে প্রথম বিশ্বে উন্নীত করতে হলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। বাংলাদেশকে আমরা প্রথম বিশ্বের একটি দেশে উন্নীত করতে চাই।

ইন্ডিয়াতে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদের কীভাবে বঞ্চিত করা হয় – তার ব্যাপক প্রমাণ রয়েছে। আর এই কারণে প্রথম বিশ্বে ইন্ডিয়ার পৌঁছার সুযোগ থাকলেও তারা পৌঁছতে পারছে না। ইন্ডিয়া ধর্মীয় সহিংসতা পরিহার করে কাউকে অবৈধভাবে বঞ্চিত না করার নীতিতে ফিরে এসে সামগ্রিক উন্নয়নে পূর্ণ মনোযোগ দিলে প্রথম বিশ্বের একটি দেশে পরিণত হতে পারবে।

তারা (ইন্ডিয়া) যেভাবে মুসলমানদের বঞ্চিত করছে-এটা বৃদ্ধি করে চাকরীতে মুসলমানদের ০% এ নিয়ে আসলেও সেটা বিবেচনা করে বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে আমাদের সেরকম আচরণ করা মোটেও ঠিক হবে না।

ইন্ডিয়াতে মসজিদ ভাঙা, নামাজীদের বেত্রাঘাত করা এরকম অহরহ ঘটছে, সেটার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের কোনো মন্দির ভাঙা কিংবা পূজারীদের বাধা দেওয়া কোনো মুসলিমের উচিত হবে না। একজনের অপরাধের জন্য অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের বিবেকবান হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে নিয়ে ইন্ডিয়ান সরকারের এহেন জঘন্য আচরণের প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে আসা উচিত। তারা এগিয়ে না আসলেও আমরা মাইন্ড করবো না। তবে দেশের অভ্যন্তরে কিছু হিন্দু ভাই হিন্দু নয় এরকম অন্যান্য সম্প্রদায়ের কিছু লোকের মতো খুন খারাবিসহ অপরাধ করলে অন্যান্যদের রাষ্ট্র বিচারের আওতায় যেভাবে আনে ঠিক একইভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাউকে আনলে সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে কিছু হিন্দু নেতা সাধারণ ও নিরীহ হিন্দুদের উস্কে দিয়ে আন্দোলনে নামিয়ে অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা কিংবা তাদের প্রশ্রয় দেওয়া চরম অপরাধ। চট্টগ্রামে আইনজীবী আলিফ প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হওয়ার পর খুনীদের বাঁচাতে খুনের দায় উল্টো মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানোর হীন চক্রান্ত কোনো হিন্দু নেতার করা, “হিন্দু মনে করে মুসলমানরাই আলিফকে খুন করেছে।”- এরকম মিথ্যা বলে গোয়েবল্সীয় কায়দায় মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার হীন কৌশল খুবই অনৈতিক। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে চট্টগ্রামের আদালত চত্বরে অবস্থিত মসজিদ ভাংচুরও কি তাহলে মন্দির মনে করে মুসলমানরাই ভেঙেছে? হাজারী লেনে সেনাবাহিনীর উপর এসিড নিক্ষেপ এর মতো জঘন্য কর্মকান্ড যা হিন্দু ভাইয়েরা নিক্ষেপ করছিল-এরকম ভিডিও ফুটেজ আছে, সেসবও কি মুসলমানরাই করেছে? আলিফকে হিন্দু মনে করে মুসলমানরা খুন করে থাকলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ১৩ জনকে (সবাই হিন্দু) শনাক্ত করার পর গ্রেফতারকৃত ৮ জন রাজিব ভট্টাচার্য্য, রুমিত দাস, সুমিত দাস, নয়ন দাস, গগন দাস, বিশাল দাস, আমান দাস ও সনু মেথর (কট্টরপন্থী আমার খুবই পরিচিত হিন্দু সম্প্রদায়ের সেই নেতার মতে) এসব হত্যাকারীরা কি মুসলিম? কেনোরো ভাই মিথ্যা ছড়িয়ে অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা। অপরাধী হিন্দু কিংবা মুসলিম যেই হোক -ধর্মীয় বিবেচনায় না এনে শাস্তি হওয়া উচিত। তাদেরকে রক্ষায় যারা চেষ্টা করবেন-তারাও কি অপরাধী নন?

প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে চাকরীতে বাংলাদেশের হিন্দু ভাইয়েরা সংখ্যার হারের তুলনায় অনেক এগিয়ে এবং এ হারটা আওয়ামীলীগের আমলেই বেশী হয়ে থাকে। আওয়ামীলীগের আমলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা বেশি নির্যাতিত হলেও চাকরীতে এই সুবিধাটি তাদের প্রতি মহব্বত করে দেওয়া হয় -এমনটা মোটেও নয়। একটি সেক্টরের একজন সচিব পর্যায়ের লোক যিনি ছাত্র অবস্থায় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, তিনি একটি চায়ের আড্ডায় (আমিসহ তিনজন ছিলাম) বলেছিলেন যে, “বিভিন্ন কারণে আওয়ামীলীগ হিন্দুদের তেমন পছন্দ করে না। তা সত্ত্বেও চাকরীতে হিন্দুদের প্রাধান্য এজন্যই দেওয়া হয়, মুসলমান আওয়ামীলীগদের বেশিরভাগই সময় ও সুযোগ বুঝে আওয়ামীলীগ বিরোধী হয়ে যায় কিন্তু হিন্দু আওয়ামীলীগরা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও আওয়ামীলীগ বিরোধী হয় না। আমি ছাত্র অবস্থা থেকে ছাত্রলীগ হয়ে আওয়ামীলীগ করলেও কোনো হিন্দু আওয়ামীলীগ না করলেও আমার থেকে সেই হিন্দুকে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামীলীগ বেশী আপন মনে করে। হিন্দুদের প্রায় সবাই আওয়ামীলীগ ব্যতীত অন্য কোথাও ভোট দেয়না বিধায় হিন্দুদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এরকম আস্থা ও বিশ্বাস। প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিৎকে মারা হলেও হিন্দু সম্প্রদায় তেমন কোনো প্রতিবাদ না করে আওয়ামীলীগকেই সাপোর্ট দিয়ে যায়। আর এ কারণে হিন্দুরা আওয়ামীলীগের আনুকূল্য পেয়ে আসছে।”

দেশে দুর্নীতি চলমান থাকাতে বিএনপির আমলেও ঘুষ দিয়ে ওসি প্রদীপের মতো জঘন্য লোকের পুলিশে চাকরী হয়। শুধু হিন্দু নয়, যোগ্য মুসলিমকে ডিঙিয়ে ঘুষের মাধ্যমে অযোগ্য আরেক মুসলিমও চাকরি পেয়ে যায়। দেশে আইনের শাসন না থাকায় এবং দুর্নীতি বিরাজমান থাকায় দেশ সঠিক রাস্তায় আসছে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশের সিংহভাগ মানুষ ইন্ডিয়াকে বাধা মনে করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে চিন্ময়কে গ্রেফতার করা হলে ইন্ডিয়ার সরকারসহ বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যেসব বলেছেন-তাতে ইন্ডিয়ার প্রতি দেশের জনগণ চরম রুষ্ট।

৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ আগের মতো নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যেকোনো বাধাকে অতিক্রম করে যাবে – এরকম দৃঢ়তা বাংলাদেশ সরকার দেখাচ্ছে। ইন্ডিয়ান কিছু বুদ্ধিজীবি বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করার জন্য মোদি সরকারকে আহবান জানাচ্ছে। এরকম ইন্ডিয়া চেষ্টা করলে ড. ইউনুস শপথ গ্রহণের পূর্বে বিদেশ থাকাকালীন ভারতীয় একটি চ্যানেলে যা বলেছেন তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে বাধ্য হলে ইন্ডিয়া চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইন্ডিয়ার নাক গলানো বুমেরাং হবে।

মুসলমানদের পবিত্র স্থানগুলো সৌদি আরবে। আত্মার সম্পর্ক থাকবে সেসব স্থাপনার প্রতি। সেই হিসেবে সৌদি আরবের প্রতিও আন্তরিকতা থাকবে কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষতি করে নয় তদ্রূপ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইদের তীর্থ স্থানগুলো ভারতে, তাদেরও ভারতের প্রতি আন্তরিকতা থাকবে কিন্তু তা-ই বলে বাংলাদেশের ক্ষতি করে নয়।

A nation can endure disbelief but not injustice. বাংলাদেশে দল, মত, ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য জাস্টিস নিশ্চিত করে দেশকে উন্নয়নের প্রকৃত রোল মডেল বানিয়ে শতভাগ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে পরিণত করা গেলে দেশের সবার মাঝে শতভাগ দেশপ্রেম জাগ্রত হয়ে দেশের ক্ষতি কেউ করবে না। দেশ ছেড়ে বিদেশে ঘরবাড়ি বানিয়ে দেশের সম্পদ হিন্দু কিংবা মুসলিম কেউ পাচার করবে না। বাংলাদেশ মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে পরিণত হয়ে সবার জন্য সুখ-শান্তি নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে ইন্ডিয়া বাংলাদেশ নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে পরোক্ষ যে হস্তক্ষেপ করে আসছে, তা থেকে নিজেদেরকে বারিত করে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে কাজ করলে বাংলাদেশের পাশাপাশি তারাও প্রথম বিশ্বের একটি দেশে পরিণত হতে পারবে। বাংলাদেশের হিন্দুরা ইন্ডিয়ান ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কাজ করলে বাংলাদেশ কিংবা ইন্ডিয়া কোনো দেশই প্রথম বিশ্বে উন্নীত হতে কস্মিনকালেও পারবে না। আর তাই উভয় দেশের বিবেকবান হিন্দুদের এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।

মুহাম্মদ আবদুর রহীম চৌধুরী
মুখপাত্র, দেশ ঐক্য।