
মুহাম্মদ আবদুর রহীম চৌধুরী
পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় ব্যতীত সব ধরনের অপরাধ আইন দ্বারা কস্মিনকালেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে আস্তিক বিরোধী যুক্তির চাষবাস ব্যাপকভাবে চলমান রয়েছেহিংসা-বিদ্বেষ পরিহারপূর্বক অবিশ্বাসীদের প্রতিও sympathy ও empathy দেখানো উচিত।
বর্তমান বিশ্বে শান্তির জন্য sympathy ও empathy খুবই দরকার। কোনো ব্যক্তি, কেনো তিনি, আপনার কিংবা আমার অপছন্দে পরিণত হলেন-তার মূল কারণ তাঁর স্থানে সাময়িকভাবে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে খতিয়ে দেখা দরকার। তার স্থানে ও পরিবেশে কারণে-অকারণে, সচেতনভাবে কিংবা অবচেতনভাবে, সঠিক কিংবা সত্যের অনুপস্থিতিতে কিংবা অবিশ্বাসীদের যুক্তির বিপরীতে বিশ্বাসীদের যুক্তির সহজলভ্যতার অভাবে আমি কিংবা আপনি পৌঁছে গেলে আমার কিংবা আপনার আচরণ কী রকম হতো? কল্পনা করুন। সঠিক যুক্তি না জানার কারণে আমি ও আপনি তার মতো কি হয়ে যেতাম না? এভাবে empathy’র চর্চা হলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র থেকে হানাহানি কিংবা দ্বন্দ্ব-সংঘাত উবে যাবে।
আর তাই বিশ্বাসীদের অবিশ্বাসীদের প্রতি সহানুভূতি (empathy) দেখাতে হবে, কেনো তাদের সেই বিশেষ অনুভূতি (there is no Creator) থাকতে পারে। কেনো তাঁরা তাঁদের মত অনুভব করে তা ভালভাবে জেনে, মূল কারণ সম্পর্কে সচেতন হয়ে, তারপর অবিশ্বাসীদেরকে প্রকৃত বিকল্প বিশ্বাসীদের দেওয়া উচিত।
Believers need to show empathy for unbelievers/disbelievers why they may have that special feeling (there is no Creator). By knowing well why they feel like that, by being aware of the root cause, believers should give them real alternative.
“নিশ্চয় আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে যারা জ্ঞানবান ও চিন্তাশীল-তাঁদের জন্য চিন্তার খোরাক রয়েছে।”- আল কোরআনমনের চক্ষু দ্বারা/অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব খুব সহজেই অনুভব করা যায়।
“সৃষ্টিকর্তা যদি না-ই থাকতো-তাহলে একজনকে সৃষ্টিকর্তা বানাতে হতো। কিন্তু প্রকৃতি বলছে সৃষ্টি কর্তা একজন আছেন।”-ভলটেয়ার।
ভলটেয়ারের উপরোক্ত কথার প্রেক্ষিতে আমার ব্যাখ্যাঃ “সৃষ্টি কর্তা নাই, পরকাল নামক কোনো কালই নাই। এই কালই প্রথম ও শেষ। আর তাই পরকালে কোনো ধরনের জবাবদিহিতার প্রশ্নই উঠে না।”-এরকম মেন্টালিটি/ধারণা যাদের মস্তিষ্কে বদ্ধমূল হবে – তাঁদের অধিকাংশই অমানবিক ও পশুবৎ হতে কোনো দ্বিধা করবেন না। নৈতিকতা কিংবা মানবিকতা, গুটিকয়েক অবিশ্বাসী – যারা প্রবল মানবিক গুণে গুণান্বিত, তাঁরা ব্যতীত বেশির ভাগ অবিশ্বাসীই পরকালের জবাবদিহিতা নাই অর্থ্যাৎ পরকাল বলতে কোনো কিছু নাই – এরকম ধারণার বশীভূত হয়ে পশুবৎ হয়ে যাবেনই যাবেন, নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতা তখন তাঁদের মধ্যে থাকবে না। উল্টো অনৈতিকতার চাষবাসে তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।
পৃথিবীর দেশে দেশে অপরাধ এর শাস্তির জন্য নানা আইন ও বিধান রয়েছে। এতে অনেক অপরাধ কন্ট্রোল হলেও পুরোপুরি অপরাধ কন্ট্রোল সম্ভব হচ্ছে না এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় ব্যতীত সব ধরনের অপরাধ আইন দ্বারা কস্মিনকালেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। আর সে জায়গায় পৃথিবীর সব মানুষ যদি অবিশ্বাসীতে পরিণত হয়ে যায় (কয়েকটি দেশে তাঁরা ইতোমধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতে পরিণত হয়ে গেছেন)-তারপ্রেক্ষিতে ব্যাপক মানুষের ব্যাপকভাবে করতে থাকা পশুবৎ অন্যায় কখনোও কি আইন দ্বারা কন্ট্রোল করা সম্ভব হবে? out of control হয়ে যাবে। পুরো পৃথিবী নৈরাজ্যের পৃথিবীতে পরিণত হয়ে যাবেই যাবে আর তাই সম্ভবত ভল্টেয়ার উপরোক্ত কথাটি বলেছিলেন।
সৃষ্টি কর্তার উপর মোটেও বিশ্বাস নেই -সে রকম একজনের সাথে গত এক বছর ধরে আমার অনেক কথোপকথন হয়। দীর্ঘ বছর ধরে তাঁর লালন করা যুক্তি ( তাঁর হাতে লিখিত অবিশ্বাসী বেশকিছু ধ্যান-ধারণাও আমাকে দেখান তিনি) -খোশমেজাজে তর্ক একের পর এক চলতে থাকে। আমিও আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকি-যাতে আমার সেই অবিশ্বাসী ভাইটি বিশ্বাসীর কাতারে এসে যায়-তাঁর লিখিত সব সন্দেহের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি উপস্থিত বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব আমি একের পর এক ঠান্ডা মাথায় দিতে থাকি। এক পর্যায়ে তিনি তাঁর জবান দিয়ে উচ্চারণ করেন যে, “There is an unseen force. যিনি সারা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছেন।” তাঁর মুখ থেকে এটা শুনা মাত্রই আমি বলি সেই আনসীন ফোর্সকে সৃষ্টি কর্তা কি বলা যায় না? তখন তিনি নিস্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ ভেবে জবাব দিলেন, “বলা যায়।”
কিছুটা নমনীয় হলেন তিনি। এরপর আরো বিভিন্ন সময়ে কথা হয় তাঁর সাথে। বিশ্বাসীদের পক্ষের যুক্তিগুলো তাঁকে শুনাতে থাকি। এখন তিনি অনেকটাপূর্বের ধ্যান ধারণা থেকে সড়ে এসেছেন।
আসলে পরিবেশের ও সাহচর্যের কারণে কিংবা আস্তিক বিরোধী লিখনী বেশী পড়তে পড়তে তাঁর এই অবস্থা হয়ে যায়। বাংলাদেশে আস্তিক বিরোধী যুক্তির চাষবাস ব্যাপকভাবে চলমান রয়েছে, তাঁদের যুক্তির বিপরীতে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা না গেলে-এদেশে তাঁদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।
আমাদেরকে দেখতে হবে আমাদের মাঝে অবস্থান করে আমাদেরই অতি আপনজন অবিশ্বাসীদের কাতারে চলে যাচ্ছে কিনা? যদি চলে যায়-ভয় দেখিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করাটা ভুল হবে। তার বিশ্বাস এর জায়গায় আপনার বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করাটাই হবে বুদ্ধিমান এর কাজ। অন্যথা ভয়ে সে বিশ্বাসীদের মতো অভিনয় করবে-লোক দেখানো ইবাদতও করতে
থাকবে, মোনাফিকে পরিণত হয়ে যাবে। “ইন্নাল মোনাফেকিনা ফিদ দারকিল আসফালে মিনান্নার।” মুনাফিক এর স্থান জাহান্নাম এর সর্ব নিম্নতম স্তরে। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা অবিশ্বাসীদের চেয়েও তাঁদের (মেনাফেকদের) পরিণতি খারাপ হবে -এটা নিশ্চিত নয় কি?
তাঁদেরকে মোনাফেক এর কাতারে অর্থ্যাৎ জাহান্নামের সর্বনিম্নতম স্তরে ঠেলে না দিয়ে কৌশল অবলম্বন করে পূনরায় আস্তিকের কাতারে নিয়ে আনা আপনার সেই আপনজনের জন্য কল্যাণকর নয় কি? আর তাই আপন জনের কল্যাণার্থে আমাদের সকলের শতভাগ সহনশীল হয়ে কাজ করা উচিত।
আসলেই মানুষের মধ্যে ভিন্ন মত বিশেষ করে পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণেই হয়ে থাকে। কেউ একবার কোনো মতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে-সে মত থেকে আবার পূর্বের মতে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে গেলে যথেষ্ট সময় তাঁকে দিতে হবে। তাঁকে ঘৃণা না করে, ভয় না দেখিয়ে-তাঁর ভিউ আন্তরিকভাবে ধীরে ধীরে জেনে নিয়ে-তাঁর বিশ্বাস কিংবা মতকে আঘাত না করে সুন্দরযুক্তি উপস্থাপন করে তাঁর সাথে কথা বলে যেতে হবে। এই সময়ে অজ্ঞতা হেতু তিনি আপনার বিশ্বাস কিংবা মতের বিরুদ্ধেও প্রবল আক্রমণাত্মক কথা বলে ফেলতে পারেন-আপনি পাল্টা আক্রমণাত্মক না বলে ধৈর্যের সাথে বলতে হবে যে, আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি এরকম বলছেন-আপনার যায়গায় আমি থাকলে হয়তো আমিও সেরকম বলতাম-এভাবে আমাদেরকে কথা বলে তাঁকে আমাদের মতে আনা ভালো, নাকি তাঁকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে আরো গভীরে/অবিশ্বাসীদের সর্বোচ্চ কাতারে পৌঁছে দেওয়া ভালো? তাঁর অবিশ্বাসী সুলভ মতের কারণে শুরুতেই যদি আমি তাঁকে বিভিন্নভাবে ব্যঙ্গ করে কথা বলতাম-তাহলে তিনি তাঁর সব আমাকে বলতেন না-আর আমিও তাঁকে বিশ্বাসীদের কাতারে আনার জন্য কোনো সুযোগই পেতাম না।
আর তাই ভিন্নমতকে পারষ্পরিক সহ-অবস্থান, আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা বজায় রেখে বকা কিংবা গালি না দিয়ে কৌশলে আমাদের প্রত্যেকের face করা উচিত।
সম্পর্ক একবার খারাপ হয়ে গেলে আপনার দ্বারা তাঁকে আর কখনো আপনার মতে আনা সম্ভব হবে না। অবিশ্বাসীদের বকা কিংবা গালি দিয়ে তাঁদের সাথে আপনার কিংবা আমার সম্পর্ক খারাপ করা মোটেও উচিত নয়। আর এতে করে তাঁদেরকে আরো দূরে ঠেলে দেওয়া ছাড়া কোনো লাভই হয় না।
তাছাড়া অবিশ্বাসীদের গালি দিতে মহান আল্লাহ তায়ালাও নিষেধ করেছেন, “তোমরা তাঁদের খোদাকে (বিশ্বাসকে) গালি দিও না, অজ্ঞতা বশত তাঁরাও তোমাদের খোদাকেও গালি দিবে।”
একাধিক ধর্মের লোক বিরাজিত সমাজে বিশ্বাস কিংবা মত যার যার, কিন্তু সু-সম্পর্ক, আন্তরিকতা, হৃদ্যতা ইত্যাদি সব ধর্ম বিশ্বাস ও মতের লোকদের আন্তরিকভাবে চাষবাস, ধারণ ও লালন করা উচিত। আর এতে করে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় থাকবে।
লেখক
মুহাম্মদ আবদুর রহীম চৌধুরী
প্রধান শিক্ষক, ওমরা মিয়া চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় ও
সহ-সভাপতি
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি
চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
আপনার মতামত লিখুন :