
হাবিবুর রহমান হাবিব
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আরাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এক অত্যন্ত সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, যা মানুষের জীবনবোধ ও বিবেকের স্বচ্ছতা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
”আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি অনেক জিন ও মানুষকে; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না, কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না।”
এই আয়াতে মানুষের শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকার পরও সেগুলোর অকার্যকারিতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের হৃদয় আছে কিন্তু সেখানে সত্যের উপলব্ধি নেই; চোখ আছে কিন্তু সৃষ্টির মাহাত্ম্য দেখার মতো দৃষ্টি নেই; কান আছে কিন্তু সত্যের আহ্বান শোনার মতো শ্রবণশক্তি নেই। যখন একজন মানুষ সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেবল পার্থিব মোহে ডুবে থাকে, তখন তার ভেতরের এই সহজাত প্রবৃত্তি ও বিবেকগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তায়ালা এ পর্যায়ে তাদের তুলনা করেছেন চতুষ্পদ জন্তুর সঙ্গে, বরং তাদের চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত হিসেবে। এই কঠোর উপমার যৌক্তিক কারণ হলো—পশুপাখি তাদের সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলে, তাদের ভুল করার বা জ্ঞানচর্চার সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষ হলো ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব; যাদের দেওয়া হয়েছে জ্ঞান, বিবেক ও ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা। মানুষ যখন সেই বিশেষ গুণাবলিকে অবহেলা করে, তখন সে তার প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মান হারায়।
আয়াতটির শেষে বলা হয়েছে, “তারাই হলো গাফিল বা উদাসীন।” গাফিলতি এমন এক ব্যাধি, যা মানুষকে অজানতেই ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। স্রষ্টাকে ভুলে থাকা, নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অচেতন থাকা এবং ন্যায়-অন্যায় বোধ হারিয়ে ফেলাই হলো চূড়ান্ত গাফিলতি।
আমাদের চোখ, কান ও হৃদয়—এই তিনটিই হলো সত্য ও হেদায়েত গ্রহণের প্রধান মাধ্যম। আমরা যদি পৃথিবীর চাকচিক্য দেখে স্রষ্টার মহিমা অনুভব না করি, কিংবা অন্যের কষ্ট দেখে হৃদয়ে সামান্যতম সহানুভূতিও না জাগাই, তবে বুঝতে হবে আমাদের বিবেক ঘুমিয়ে আছে। এই আয়াতটি আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রতিটি ইন্দ্রিয় ও অনুভূতির হিসাব দিতে হবে। সময় থাকতেই যদি আমরা আমাদের দৃষ্টি, শ্রবণ ও হৃদয়কে সত্যের পথে নিবদ্ধ করতে পারি, তবেই আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা, সুনামগঞ্জ।
আপনার মতামত লিখুন :