নবীগঞ্জে চার ভাগে বিভক্ত বিএনপি তৃণমূলে ক্ষোভ


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৫, ১১:৩৭ অপরাহ্ন /
নবীগঞ্জে চার ভাগে বিভক্ত বিএনপি তৃণমূলে ক্ষোভ

নুরুজ্জামান ফারুকী হবিগঞ্জ থেকে

নবীগঞ্জে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় চার ভাগে বিভক্ত বিএনপি। দৃশ্যমান এ বিরোধ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়াও তুমুল জনপ্রিয় দুই নেতা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু ও পৌর বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আলীম ইয়াছিনীর বহিষ্কারাদেশ এবং সাবেক পৌর মেয়র ছাবির আহমদ চৌধুরীর দলীয় পদে স্থগিতাদেশ নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। কাউন্সিলের স্থান নিয়ে মতানৈক্যসহ বিভিন্ন অজুহাতে ৮ দফায় উপজেলা বিএনপি’র কাউন্সিল স্থগিত হয়। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ ও উভয় গ্রুপের সম্মতিতে গত ৩রা আগস্ট উপজেলার বাংলাবাজারস্থ সোনার বাংলা মডেল হাইস্কুলে অনুষ্ঠিত হয় উপজেলা বিএনপি’র কাউন্সিল। উপজেলার কাউন্সিল হলেও ভেস্তে গেছে পৌর বিএনপি’র কাউন্সিল। সিলেট বিভাগ বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ জিকে গউছের প্রচেষ্টায় গত ১৯শে আগস্ট দিনভর প্রচেষ্টার পরও কাউন্সিল নিয়ে সমঝোতা হয়নি। হবিগঞ্জ জেলার সবক’টি পৌর ইউনিটের কাউন্সিল হলেও নবীগঞ্জ পৌরসভায় এখনো সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে অজানা হস্তক্ষেপ আর কথিত অভিযোগে সাবেক পৌর বিএনপি’র সভাপতি ও দুইবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী মেয়র আলহাজ ছাবির আহমদ চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিত হয়। গত ২২শে সেপ্টেম্বর তার দলীয় পদ স্থগিত করে কেন্দ্রীয় বিএনপি।

দলীয় সূত্র জানায়, উপজেলা বিএনপি বিগত প্রায় একযুগ ধরেই বিভক্ত। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী সদস্য ও সাবেক এমপি আলহাজ শেখ সুজাত মিয়া এবং উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু বলয়ে দৃশ্যমান বিভক্ত বিএনপি। দলের ক্রান্তিকালে শেফুর নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপি’র ১৩ ইউনিয়নে কাউন্সিলে কমিটি গঠিত হয়। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট প্রার্থী অর্থনীতিবিদ ডা. রেজা কিবরিয়াকে ধানের শীষ দেয়া হয়। তাকে বিজয়ী করতে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুজিবুর রহমান শেফু। গুলির অর্ডার উপেক্ষা করে রেজাকে বিজয়ী করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় হাইকমান্ডের নজরে আসেন। এ সময় দলের মনোনয়নবঞ্চিত শেখ সুজাতের সঙ্গে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে বিগত উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন মুজিবুর রহমান শেফু। দলের নির্দেশনা অমান্য করে প্রার্থী হয়ে বিজয়ের পরপরই বহিষ্কার হন। বহিষ্কৃত হলেও তৃণমূলে অবস্থান ধরে রাখেন। আওয়ামী লীগের কোনো প্রলোভন তাকে নীতি থেকে টলাতে পারেনি। বহিষ্কৃত হলেও ১৩ ইউনিয়নে দলীয় নেতৃত্ব ধরে রাখেন। এরই অংশ হিসেবে বিগত ৩রা আগস্ট অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সাবেক এমপি আলহাজ শেখ সুজাত সমর্থিত প্যানেলকে পরাজিত করে শেফু বলয়ের নেতারা সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকসহ সবক’টি পদে বিজয়ী হয়। কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এমজেড জাহিদ হোসেন, বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন, সিলেট বিভাগ বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ জিকে গউছসহ জাতীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

এ ঘটনায় ফের আলোচনায় আসেন উপজেলা বিএনপি’র বহিষ্কৃত নেতা মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু। সকল জল্পনা, কল্পনা ও নাটকীয়তা শেষে উপজেলা কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে ফের দুই বলয়ে উত্তেজনা দেখা দেয়। কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলেও কোনো সুরহা হয়নি। ওদিকে, পৌর বিএনপি’র কাউন্সিল নিয়েও বিপত্তি দেখা দেয়। হবিগঞ্জ জেলার ৮টি উপজেলা ও ৫টি পৌর কমিটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও নবীগঞ্জ পৌরসভায় কাউন্সিল হয়নি। বিগত উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে অংশ নিয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হন পৌর বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আলীম ইয়াছিনী। এছাড়াও পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড কমিটির কউন্সিল ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে পৌর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও মেয়র আলহাজ ছাবির আহমদ চৌধুরী বলয়ের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। পৌর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিনের নেতৃত্বে বিভক্তি দেখা দেয়।

বিরোধ নিরসনে ২৩শে আগস্ট শহরের একটি চানিজ রেস্টুরেন্টে দিনব্যাপী সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন- সিলেট বিভাগীয় বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ জিকে গউছ, সাবেক এমপি আলহাজ শেখ সুজিত মিয়া, পৌর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে বিজয়ী দুইবারের মেয়র আলহাজ ছাবির আহমদ চৌধুরী। বিদ্যমান দুই গ্রুপের সামনে গঠিত ৯টি ওয়ার্ড কমিটির মধ্যে ৮টির যাচাই-বাচাইয়ের শেষপর্যায়ে নামাজের বিরতিতে হট্টগোল হয়। তুচ্ছ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নেতারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। ভেস্তে যায় পৌর বিএনপি’র কাউন্সিল। এ ঘটনায় কথিত ইন্ধনের অভিযোগে সাবেক মেয়র আলহাজ ছাবির আহমদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও নুরুল আমিন। এরই প্রেক্ষিতে ছাবির চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিত করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। কেন্দ্রর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলেও কাউন্সিল বা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়নি। এভাবেই উপজেলা ও পৌর বিএনপি চার ভাগে বিভক্ত হয়। দলীয় গ্রুপিং ও বিভক্তি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বহিষ্কার ও স্থগিতাদেশ নিয়ে তুমুল জনপ্রিয় ওই নেতারা দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ছাড়াও উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র নেতারা দ্রুত বহিষ্কার ও স্থগিতাদেশ  প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।