ফুটপাত ও বস্তি দখলমুক্ত: আগে পুনর্বাসন, পরে উচ্ছেদ এটিই হওয়া উচিত মূলনীতি।  


Nazrul Islam প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১১, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ন /
ফুটপাত ও বস্তি দখলমুক্ত: আগে পুনর্বাসন, পরে উচ্ছেদ এটিই হওয়া উচিত মূলনীতি।   

নজরুল ইসলাম

দেশের ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং হকারদের পুনর্বাসন—এই দুটির মধ্যে কোনটি আগে হওয়া উচিত, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর সাথে মানবাধিকার এবং নগর ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য জড়িত।

আমার আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে ফুটপাত দখলমুক্ত ও বস্তি থেকে লোক উচ্ছেদ। আমার একান্ত ব্যক্তিগত এই ভাবনাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যিনি দেশের সহজ-সরল সাধারণ জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন দেখিয়ে বলেছিলেন “আই হ্যাভ এ প্লান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার উল্লেখিত এই সমস্যা সম্পর্কে আপনার সরকারের আদৌকি যৌক্তিক কোনো পরিকল্পনা আছে?

যেকোনো দেশের স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সরকারের দূরদর্শী ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য। ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ বা চিন্তাভাবনা ছাড়াই দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নিলে অনেক সময় তার ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে। যেকোনো বড় পরিবর্তনের আগে জনগণের পালস বোঝা প্রয়োজন। হঠকারী সিদ্ধান্ত অনেক সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

বস্তি থেকে লোক উচ্ছেদ ফুটপাত দখলমুক্ত করার পূর্বে তাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা কেবল মানবিক কারণেই নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ও স্থিতিশীল নগর গড়ার জন্যও অপরিহার্য। হুট করে উচ্ছেদ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শহরের ভারসাম্য নষ্ট করে।

অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক যেকোনো নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত সাধারণত টেকসই হয় না। ​সাময়িক সুবিধা বা রাজনৈতিক কৌশলের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক পদক্ষেপ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। ​সরকার যখন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। হঠকারিতা এড়াতে হলে প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রযাত্রা নির্ভর করে গঠনমূলক আলোচনা এবং ধীরস্থির পরিকল্পনার ওপর। হঠকারিতা কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই তৈরি করে না, বরং সরকারের ওপর জনগণের আস্থাও কমিয়ে দেয়।

এবার আসেন ফুটপাতে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করে, তারা মূলত সমাজের নিম্নআয়ের মানুষ। হুট করে তাদের উচ্ছেদ করলে হাজার পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে উপার্জনের পথ হারিয়ে ফেলবে। এতে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বাড়তে পারে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের সরিয়ে নেওয়া বা সরকারি খোলা জায়গায় মার্কেট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা টেকসই সমাধানের অল্টারনেটিভ রাস্তা হতে পারে।

একই সময়ে রাস্তা বন্ধ করে দুই পাশে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদেরকেও মাথায় রাখতে হবে, ​পথচারীদের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার কারণে ​পথচারীরা মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হয়, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। ​শহরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ​পঙ্গু, বৃদ্ধ ও শিশুদের চলাচলে চরম ভোগান্তি হয়। ​এই যুক্তিতে নাগরিক শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসন অনেক সময় আগে উচ্ছেদকে অগ্রাধিকার দেয়।

তবে সামগ্রিকভাবে সরকারকে সমন্বিত সমাধান খুঁজতে হবে। ​উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসন আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নয়। এর জন্য সরকার ও তার যথাযথ মন্ত্রণালয় প্রকৃত হকার কারা তাদের তালিকা তৈরি করা, যাতে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী ‘হকার’ সেজে জায়গা দখল করতে না পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতো নির্দিষ্ট সময় ফুটপাতে বসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা খালি জায়গায় হকারদের জন্য আধুনিক ও সুশৃঙ্খল মার্কেট তৈরি করে দেওয়া।

অনেক সময় উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টা পরেই জায়গা আবার দখল হয়ে যায়। এটি রোধে কঠোর আইনি তদারকি প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ করলে সমস্যা সাময়িকভাবে মেটে, কিন্তু হকাররা আবার ফিরে আসে। আবার পুনর্বাসনের অপেক্ষায় বছরের পর বছর ফুটপাত দখল করে রাখা জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ। তাই উচ্ছেদের সমান্তরালে বা তার ঠিক আগে একটি বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই হলো সবচেয়ে যৌক্তিক পথ।

যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে যা লিখে শেষ করতে চাই, পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে বা বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করলে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হীন গৃহহীন হয়ে পড়ে, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ​আগে পুনর্বাসন, পরে উচ্ছেদ: এটিই হওয়া উচিত মূলনীতি।

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট, চিপ এডিটর – thesylhetpost.com, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ওয়ার্কার, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইউনিসন ( আরএম)