
হাবিবুর রহমান হাবিব, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা-সুনামগঞ্জ।
চৈত্র সংক্রান্তির শেষ বিকেল। দাড়াইন নদীর ওপার থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসটা আজ একটু বেশিই উদাসীন শোনাল। ৮ বছর বয়সী আরাফাত রহমান প্রিন্স জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক চেয়ে আছে আকাশের দিকে। তার বাবা তাকে বারবার বলেছে, “প্রিন্স, পহেলা বৈশাখে আমরা শহরের বড় পার্কে যাব, সেখানে কত রঙবেরঙের খেলনা থাকবে!”
কিন্তু প্রিন্সের মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। তার শৈশব কাটে শহরের যান্ত্রিকতায়, অথচ তার রক্তে বইছে হাওর আর মাটির টান। সে চায় তার দাদুর সেই পুরোনো গ্রাম আর সত্যিকারের বৈশাখ দেখতে।
যাত্রার শুরু:
পহেলা বৈশাখের আগের রাতে হঠাৎ বায়না ধরল প্রিন্স। তার জেদের কাছে হার মেনে শেষমেশ তাকে নিয়ে বাবা রওনা হলেন সুনামগঞ্জের সেই প্রিয় মেঠোপথে। সকালে যখন ভোরের সূর্যটা ছায়া হাওরের বিশাল জলরাশির ওপর লাল আভা ছড়াচ্ছে, তখন প্রিন্স এসে পৌঁছাল তার দাদুর ভিটেয়।
উঠানে পা রাখতেই প্রিন্স দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য। দাদু একা হাতে মাটির উঠানে সাদা পিটুলি দিয়ে আলপনা আঁকছেন। প্রিন্স দৌড়ে গিয়ে দাদুর হাত থেকে তুলিটা নিয়ে নিল। পরম মমতায় বলল, “দাদু, আমি তোমাকে সাহায্য করব!”
শেকড়ের সন্ধান:
দাদু তার নাতিকে পাশে বসিয়ে শোনালেন পুরোনো দিনের বৈশাখের গল্প। প্রিন্স অবাক হয়ে শুনল, একসময় বৈশাখ মানে ছিল না কেবল লাল-সাদা পাঞ্জাবির ফ্যাশন শো; বরং বৈশাখ ছিল প্রতিবেশীর সাথে মেলামেশা আর ‘হালখাতা’র নতুন আনন্দ। দাদু তাকে নিয়ে গেলেন সেই ঐতিহাসিক কালনী নদীর পাড়ে। সেখানে মেলা বসেছে—কোনো কৃত্রিম আলো নেই, নেই কোনো বড় নাগরদোলা। আছে মাটির ব্যাংক, হাতে তৈরি পুতুল আর রঙিন বাতাসা।
প্রিন্স তার শখের খেলনা গাড়িগুলোর কথা একদম ভুলে গেল। সে মেলার ধুলোমাখা পথে খালি পায়ে হাঁটতে লাগল। তার দুচোখে তখন রাজ্যের বিস্ময়। সে দেখল, কৃষক কীভাবে রোদে পুড়ে সোনার ফসল ঘরে তুলছে। দাদু বললেন, “প্রিন্স, এটাই আমাদের বৈশাখ। মেহনতি মানুষের নতুন বছরের স্বপ্ন।”
গল্পের মোড়:
শহরে ফেরার সময় বাবা যখন প্রিন্সকে জিজ্ঞেস করল, “কিরে প্রিন্স, পার্কে না গিয়ে তোর কি মন খারাপ?”
প্রিন্স তার ছোট ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরা মাটির ঘোড়াটি উঁচিয়ে বলল, “না বাবা! আজ আমি আমার সত্যিকারের বাড়িকে চিনেছি। দাদুর মাটির আলপনা আর এই মেলার পুতুলগুলোই আমার কাছে পৃথিবীর সেরা।”
প্রিন্সের বাবা অবাক হয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বুঝলেন, প্রযুক্তির এই যুগেও তার ছেলে বড় হচ্ছে এক শক্তিশালী শেকড়কে আঁকড়ে ধরে।
উপসংহার:
শহরের যান্ত্রিক জীবনে ফিরেও প্রিন্স তার পড়ার টেবিলের স্মার্টফোনটি সরিয়ে সেখানে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে মেলা থেকে আনা সেই মাটির ঘোড়া। তার ছোট্ট মনে এখন এক বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন—যে বড় হয়ে লিখবে তার মাটির কথা, তার হাওরের মানুষের কথা।
আপনার মতামত লিখুন :