
মাহবুবুল আলম।।
বাইরে মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তিথি জানালায় বসে বৃষ্টির ছন্দ সুরে বিভোর হয়ে ভাবছে নানান কথা। জীবনে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে। এমন ঝুম বৃষ্টি অনেক দিন দেখেনি তিথি। অফিসের কর্মব্যস্ততা, সাংসারিক বিবিধ ঝামেলায় কখনো এতো নিবিড়ভাবে বৃষ্টি দেখার সুযোগ পায়নি; কিন্তু করোনাকালীন লকডাউনের কারণে
এখন অখন্ড অবসর। ঘরবন্দি জীবনে বৃষ্টির ঝঙ্কার অনেকটাই কাটিয়ে দেয় মনের আতান্তর। জীবনের নানান অলিগলি পেরিয়ে মন ছুটে যায় দুরন্ত যৌবনের সোনাঝরা সেসব দিনগুলোতে।
করোনার আগ্রাসী তান্ডব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য সরকার তৃতীয়বারের মতো লকডাউন দিয়েছে। এবারের লকডাউনকে টোটালি শাটডাউন বলতে যা বোঝায় তাই করছে সরকার। অফিস আদালত, ব্যাংক, বীমা, শিল্প কারখানা সবকিছুই বন্ধ। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওষুধের দোকানপাট ছাড়া অলআউট সব কিছুই বন্ধ রয়েছে। আর করোনা শুরুর প্রথম দিন থেকে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এবারের লকডাউন কার্যকর করার জন্য বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে।
দিন দিন বাড়ছে করোনার তান্ডব। এ পর্যন্ত বিশ হাজারের ওপর মানুষ মরেছে। আক্রান্ত এগার লক্ষের ওপর। এ অবস্থায় ঘরবন্দী মানুষ এক অনিশ্চিত পথে হাঁটছে। তিথিও ভয়ে কাবু হয়ে আছে একাকীত্ব ও নানান হতাশা ও বৈরী ভাবনায়।
কিন্তু শ্রাবণের এই অঝোরঝরার বৃষ্টি তিথিকে আনমনা করে তোলছে পেয়ে বসেছে নস্টালজিয়ায়। এ মুহুর্তে অতীতের অনেক স্মৃতির ভিড় ঠেলে সাগর এসে ঢুকে পড়েছে তিথির ভাবনার জগতে। তিথি চেষ্টা করছে তাকে এড়িয়ে যেতে কিন্তু কিছুতেই মনের ভেতর অনুপ্রবেশ করছে সাগর। পাশে বসেই শুরু করেছে নানান কথা-
কী গো সুন্দরী তিথি? বৃষ্টির জানালায় বসে এমন করে কার কথা ভাবছো?
: তা জেনে তোমার লাভ কী বিট্রেয়ার!
: আমি বিট্রেয়ার না তুমি?
: আমি কেন হতে যাবো। তুমিইতো বিট্রে করে আমার জীবনটাকে তচনচ করে দিয়েছো। আমি তো ব্যাগ গুছিয়ে তৈরিই ছিলাম তোমার সাথে চলে যাওয়ার। কিন্তু কাপুরুষের মতো আমার আহ্বানকে এড়িয়ে গেছো সেদিন।
: ও হ সেকথা। আমি তো তোমাকে বলেছিলাম, চলে আসার বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য। তা ছাড়া আমি তখন বেকার তোমাকে নিয়ে কোথায় যাবো, কোথায় ওঠবো ভেবে কোন কূলকিনারা করতে না পেরে আমি সে দিন আসিনি। এরপর থেকে তুমি আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে। আমি লিলির মাধ্যমে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম
কিন্তু তুমি পাত্তা দাওনি। আমি যখন তোমার সাথে যোগাযোগ করতে মরিয়া তখনই শোনলাম, তুমি তোমার এক তালতো ভাইকে বিয়ে করে ফেলেছো।
: না আমি তালতো ভাইকে ইচ্ছা করে বিয়ে করিনি। আমার সৎমায়ের যোগসাজশে তারই এক আত্নীয় এমএসসি পরীক্ষার শেষ দিন সে আমাকে অপহরণ করে জোর করে বিয়ে করেছিল।
: ও তা একই কথা। ইচ্ছা না থাকলে কেউ কাউকে জোর করে বিয়ে করতে পারে না।
: তুমি আস্তো একটা বিট্রেয়ার। যাও আমার সামনে থেকে! নিজেকে নিজে ধমকায় তিথি। মুহূর্তে তিথির ভাবনা থেকে সরে যায় সাগর।
তিথির স্বামী হাসান মোটামুটি মাধ্যম সারির একজন ব্যবসায়ী। তিথি নিজেও ভাল বেতনে চাকরি করে। ঢাকায় তাদের চেইনশপের তিনটি শাখা আছে। লকডাউনে সব কিছু বন্ধ থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চেইনশপ গুলো বন্ধ নেই। তাই হাসানের ব্যস্ততা ঠিকই আছে। তিথির বিয়ে হয়েছে পনের বছর হতে চললো, কিন্তু এখনো তারা নিঃসন্তান। কোনো বাচ্চা হয়নি তাদের। তিথি গাইনোকলজিস্ট দেখিয়েছে ডাক্তার বলেছেন তার কোনো সমস্যা নেই। বলেছিল তার হাসবেন্ড হাসানকে দেখানোর জন্য, কিন্ত ডাক্তার দেখাতে হাসান রাজি নয়। এনিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয়। কিন্তু
হাসানের এক কথা- আমার কোনো সমস্যা নেই। তাই আমি ডাক্তার দেখাবো না। টেস্টটিউব বেবি নিতেও হাসান রাজি নয়। সে এ প্রসঙ্গে বলে- যারা নিঃসন্তান তারা কি পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তোমার কী কোনো কিছুর অভাব আছে বাচ্চার নেয়ার বিষয়টি নিয়ে যখন তখন ঘ্যানরঘ্যানর কর।
: আমি ঘ্যানরঘ্যানর করি তা তুমি বোঝ না। মাতৃত্বের আকাঙ্খা তুমি বোঝ না বলেই তুমি এ কথা বল।
কষ্ট করে হলেও নিঃসন্তানের বিষয়টি মেনে নিয়েছিল তিথি। কিন্তু তার স্বামীর চরিত্রের বিষয়টি কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি সে। বাসার কাজের মেয়েদের প্রতি তার লালসার কারণে কাজের মানুষ রাখতে পারে না বাসায়। এক কাজের মেয়ে তো তাকে ব্লাকমেইল করা শুরু করে। পরে থানা পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য কাজের মেয়েকে এক লাখ টাকা দিয়ে রক্ষা পেয়েছিল সে যাত্রায়। তারপর আরো দুইবার তিথির হাতেনাতে ধরে পড়ে। তাবু তার চরিত্র পরিবর্তন হয়নি। বাবার বাড়িতে সৎমায়ের সংসারেও যেতে পারে না অশান্তির কারণে। তাই এসব সহ্য করে এখানেই থাকতে হচ্ছে তিথিকে।
আজও মন থেকে হাসানকে মেনে নিতে পারেনি তিথি। তাকে অপহরণ করে জোর করে বিয়ে করার ঘটনাটি তিথির মনে চোরকাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। যা সবসময় মনের গোপন গহনে খোঁচায়। সে দিন ছিল তিথির এমএসসির ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন। তিথি তার ব্যাচমেটদের সাথে পরিকল্পনা করেছিল পরীক্ষা শেষে তারা রমনাগার্ডেন রেস্টুরেন্টে একটা হালকা পার্টির করবে। সে হিসেবে বান্ধবীরা মিলে নিজেদের মধ্য থেকে চাঁদাও তুলেছিল। কিন্তু সে দিনের তাদের এ আয়োজনকে হরষেবিষাদ পরিনত করেছিল হাসান ও তার কয়েক বন্ধু। তিথিরা যখন হল থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে রমনাগার্ডেন রেস্টুরেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই একটা কালো কাচের মাইক্রোবাস থেকে নেমে তিথিদের পথ আগলে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে তারা জোর করে তিথিকে ওঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। এক বাসায় আটকে রেখে জোর করে তিথিকে বিয়েতে বাধ্য করা হয়। সেদিনের স্মৃতি মনে হলে তিথি আজও শিহরে ওঠে। জোর করে বিয়ে হলেও মন থেকে হাসানকে কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি তিথি।
যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি হয় তখনই সাগরের কথা বেশি মনে পড়ে তিথির। আর মনে পড়ে শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টির দিনে। তখনই বিষণ্ন মেঘে ছেয়ে যায় তার মনের আকাশ। সাগরকে ভুলে থাকতে চেয়েও ভুলে থাকতে পারে না। যখন তখন সে ভাবনায় এসে হানা দেয়।
তিথির তিন বছর পর বিয়ে করেছে সাগর। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে তার এখন ভরা সংসার। সে এখন একটা বেসরকারী ব্যাংকে ভিপি হিসেবে কর্মরত; তিথি ভাবে সাগরের সাথে বিয়ে হলে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। এসব ভাবতে গেলে তিথি আর নিজের মধ্যে থাকতে পারেনা সাগরের সাথে মাত্র এক বছরের সম্পর্কে সে যতটা ভালোবাসা দিয়েছে পনের বছরের সংসার জীবনে হাসানের কাছ থেকে সে এতটুকু ভালোবাসা পায়নি।
আরো জোরে বৃষ্টি নেমেছে এখন। এতো বৃষ্টি যে সামনে কয়েক গজ দূরেই দেখা যাচ্ছে না। এসময় শুশুকের মতো ভুশ করে ভেসে ওঠে সাগরের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি। হঠাৎ করেই এক স্মৃতির সাগরে ডুবে যেতে থাকে তিথি।
এক বই মেলায় সাগরের সাথে তিথির পরিচয়। সেই বৎসর সাগরের ‘নিলাঞ্জনা তোমাকে’ নামের একটা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। তিথি তার বান্ধবী লিলির সাথে সেই দিন বই মেলায় গিয়েছিল। মেলা ঘুরে একটা স্টলের কাছে মোটামোটি একটা ঝটলা দেখে লিলি এবং তিথি সেই স্টলের কাছে গিয়ে দেখে একটা লম্বা চওড়া সুদর্শন ছেলে অটোগ্রাফ দিচ্ছে। উৎসুকভাবে তিথি একজনকে জিজ্ঞেস করে।
: কী হচ্ছে এখানে।
: ওনি একজন কবি। যারা ওনার বই কিনছে তাদেরকে ওনি অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। একজন ক্রেতা এ কথা বললো তিথিকে।
: ধন্যবাদ আপনাকে। বলেই একজন সেলসগার্লকে ডেকে তিথি বলল-
: আপু অই কবির একটা বই কি দেওয়া যাবে?
:নিশ্চয়। একমিনিট প্লিজ। পাশের রেক থেকেই একটা বই এনে সেলসগার্ল বলেন-
এই নিন আপু। বইটি কি আপনি নেবেন?
: জ্বি আপু, মেমো করে দিন।
তিথি বইটি নিয়ে লেখকের সামনের কিউতে গিয়ে দাঁড়ায়। ক্ষানিক পরেই লেখক বলে-
: দিন বইটি। তিথি বইটি এগিয়ে দিতেই খসখস করে লিখে দিল। শুভেচ্ছা নিরন্তর। এর নিচে নিজের নাম স্বাক্ষর করা ‘অনিন্দ্য রহমান’
লেখকের কাছ থেকে বইটি নিতে নিতে তিথি বলে-
: এক্সকিউজ মি! আপনার কি ভিজিটিং কার্ড হবে?
: স্যরি। আমার কোনো ভিজিটিং কার্ড নেই।
: ওকে, থেঙ্কস।
সেদিন বাসায় ফিরে চা খেয়েই তিথি বইটি নিয়ে বিছানায় শুয়ে মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কবিতা পড়তে শুরু করে। এর আগে পাঠ্যসূচির বাইরে তেমন কোনো কবিতা পড়েনি। আজকালকের অধিকাংশ কবির কবিতাই এতটাই দুর্বোধ্য যে, কবিতা তাকে তেমন টানতে পারতো না। তাই আধুনিক বাংলা কবিতা থেকে নিজকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল সে। কিন্তু অনিন্দ্য রহমানের প্রতিটি কবিতাই এত সুন্দর ও ছন্দ, মাত্রা, উপমা অলঙ্কার প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা তা যে কোন পাঠকে মুগ্ধ করবে। আশি পৃষ্ঠার বইটি রাত দশটার মধ্যে পড়া শেষ করে। ডিনার সেরে তিথি ঘুমাতে যায়। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না।
মনে হচ্ছে কবি যেন তার জীবনের পাওয়া না পাওয়া দুঃখ বেদনা ও জীবনের গল্প নিয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন নিলাঞ্জনা নামের মেয়েটি যেন তিথি।
এরপর থেকে বদরুন্নেসা কলেজ থেকে প্রতিদিনই তিথি বইমেলা যেতো। অনিন্দ্য রহমানের সাথে দেখা হলে আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক যে গড়ে ওঠছে তা উভয়েই বুঝতে পারে। এরপর সেলফোন নম্বর আদানপ্রদানের পর সেলফোনে কথা বলতে বলতে উভয়ের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবির মন সাগরের মতো সুন্দর ও বিশাল বলে তিথি অনিন্দ্য রহমানের একটা নিকনেম দেয় সাগর। অনিন্দ্য রহমান তার এ নিকনেম শুনে হো হো হো হো করে হেসে বলেছিল
ঠিক আছে ম্যাডাম আপনার যা ইচ্ছা তাই ডাকুন।
তখন অনিন্দ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করে চাকুরী খোঁজার পাশাপাশি বিবিএস এর প্রস্ততি নিচ্ছিল। আর বদরুদ্দোজা কলেজে বিএসসি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছিল তিথি। সাথে সাথে চলছিল দুজনের মন দেয়া নেয়া। সারারাত জেগে ভিডিও কলে মেতে থাকা সবই চলছিল নিয়ম করে। একদিন তিথি বলে-
: দেখ এই ভিডিও চ্যাটিং আর ভাল লাগে না। তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি না।
: তাহলে কী করতে চাও?
: আগামীকাল আর চ্যাটিং নয়, ডেটিং করতে চাই।
তোমার সময় হবে? তিথি বলেছিল।
: কেন হবে না, কখন কোথায় আসতে হবে বল।
: আগামীকাল তিনটায়। ওসমানী উদ্যানে।
: ওকে সুইট ডার্লিং।
: তবে আমার একটি শর্ত আছে।
: কী শর্ত? সাগর জানতে চায়।
: কোনো কথা নয়, তুমি শুধু তোমার লেখা কবিতা আবৃত্তি করবে, আর আমি মুগ্ধ হয়ে শোনবো।
: ওকে তাই হবে ম্যাডাম। তাই হবে।
সেটা ছিল শ্রাবণের এমনই একদিন। বিকেল তিনটায় তিথি এসে ওসমানী উদ্যানে এসে ঢুকে। কিন্তু চারদিকে খুঁজে বেড়ায় সাগরকে। কোথাও সে নেই। তিথি পার্স থেকে সেলফোন বের করে সাগরকে ফোন করে। পাশে কোন এক জায়গায় সাগরের
মোবাইলের রিংটোন শুনে তিথি বুঝতে পারে হারামিটা এখানে কোথাও আছে। তিথির ভাবনার মাঝেই পাশের একটা ঝোপ থেকে সাগর বেরিয়ে আসে। সাগরকে দেখেই হাসতে হাসতে তিথি বলে
: ওরে হারামি, এখানে থেকেই আমাকে ঘাবড়ে দিয়েছো। বলেই সাগরের পেটে চিমটে ধরে মোচড়ে দেয়। সাগর হেসে হেসে বলে-
: ও ছাড় ছাড় ব্যথা লাগছে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুনসুটির মধ্যেই অদূরেই একটি হেলান বেঞ্চে গিয়ে দুজন বসে। কথা অনুযায়ী সাগর কবিতা আবৃত্তি শুরু করে। আর তন্ময় হয়ে তিথি সাগরের ভরাটকন্ঠের আবৃত্তি শুনে যাচ্ছে। এমন উদাস দুপুরে হঠাৎ করেই কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়। আবৃত্তির শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে নামে ঝুম বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই দুজন ঠায় বসে থেকে বৃষ্টিতে ভিজছে। দেখে মনে হবে এরা শ্রাবণধারায় ভেজার জন্যই এখানে এসেছে। গাড়ি রিক্সায় যারা যাচ্ছে তারা দুজনের এমন বৃষ্টি ভেজা দেখে অদ্ভুত হাসি হাসছে। এক রিক্সাওয়ালা মুখে আঙুল ঢুকিয়ে সিটি বাজিয়ে গেল কিন্তু সেদিকে যেন তিথি ও সাগরের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। দুজন ভিজেই যাচ্ছে। এভাবেই প্রায় একঘন্টা ওরা বৃষ্টিতে ভিজে।
সোয়া চারটার দিকে বৃষ্টি থেমে চকমকে রোদ ওঠে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাকিটা সময় এখানে বসেই কীভাবে তারা জীবন সাজাবে সে গল্প করেই কাটিয়ে দিল। এর মধ্যেই শরীরের উষ্ণতা ও বিকেলের রোদে ওদের গায়ের ভেজা কাপড় শুকিয়ে গেছে।
উদ্যানের এবং সড়ক বাতিগুলো জ্বলে ওঠতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। রাত নেমে এলেই গাজোটি ও হিরোইন খোররা উদ্যানে মাদকের নীল নেশায় মত্ত হবে। এভেবেই তিথি ও সাগর ওসমানী উদ্যান থেকে বেরিয়ে যায় সাগর একটা রিক্সা ডেকে তিথিকে রিক্সায় ওঠিয়ে দিয়ে সাগর এগিয়ে যেতে থাকে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
তিথির বিয়ে দিতে পারছিল না বলে তার বৈমাত্রেয় বোনদের বিয়ে হচ্ছে না বলে তিথির সৎমা তিথিকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। সে অবস্থায় তিথি অনিন্দ্যর কথা বাবাকে বললে বেকার ছেলের কাছে বিয়ে দেবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতে তিথি সাগরের কাছে চলে আসার কথা বললে, সাগর বলেছিল-
: দেখ আমি নিজেই মেসে থাকি, তোমাকে এনে কোথায় তোলবো, এটা বোঝার চেষ্টা কর!
: আমি এত কিছু বুঝি না। আমি রাতে তৈরি থাকবো তুমি এসে নিয়ে যাবে। এটাই আমার শেষ কথা। কিন্তু সে রাতে তিথি তৈরি হয়ে থাকলেও। সাগর আসেনি। তাই রাগ করে তিথি সাগরের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।
এরপর মাস দুয়েকের মধ্যেই একটি বেসরকারি ব্যাংকে সাগরের চাকুরী হয়ে যায়। সাগর চলে যায় তার কর্মস্থল খুলনায়। আর সৎমায়ের কারসাজি ও সহযোগীতায় তিথিকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দূর সম্পর্কের এক তালতো ভাই। বাবা জেনেও
কোনো প্রতিকার করেনি; তার আচরণে মনে হয়েছে ওনিও এটাই চেয়েছিলেন। এরপর তিথি রাগে ও অভিমানে সাগরের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু যোগাযোগ বন্ধ করলেও মন থেকে কোনদিন সাগরের নাম মুছে ফেলতে পারেনি। তবে লিলির বাসায় গেলে সাগরের সম্মন্ধে খোঁজখবর নেয় তিথি।
অনেক বছর পরে লিলির মাধ্যমে যোগাযোগ হয় দুজনের। ফোনে মাঝে মাঝে কথা হয়। এরই মধ্যে কয়েক বার লিলির বাসায় সাগরের সাথে দেখা হয়।
হঠাৎ তিথির আশেপাশে কোথাও বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতের বিকট আওয়াজে তিথি ভাবনারা সব বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। জানালার পাশ থেকে তিথি সরে যায়। তখনও বৃষ্টি থামার কোনো নাম গন্ধ নেই।
আপনার মতামত লিখুন :