খাদি কাপড়ের অনলাইন ব্যবসায় সফল নারীরা


দ্যা সিলেট পোস্ট প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১২, ২০২২, ১২:২৮ পূর্বাহ্ন /
খাদি কাপড়ের অনলাইন ব্যবসায় সফল নারীরা

ডেস্ক রিপোর্ট। দি সিলেট পোস্ট

উম্মে ছালমা আজাদ সুমি। স্বামীর সরকারি চাকরির সুবাদে দুই পুত্র সন্তানকে নিয়ে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরে বসবাস শুরু করেন। এরই মধ্যে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ মাস বয়সি কন্যাকে হারান তিনি। তার মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না সুমি।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে যান তিনি। স্ত্রীর একাকীত্ব দূর করতে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন স্বামী আনোয়ার হোসেন নিপু।

স্বামীর কথামতো কুমিল্লার ঐতিহ্য খাদি নিয়ে কাজ শুরু করেন সুমি। খাদি কাপড় কিনে নিজের হাতে বাহারি ব্লক ও নকশী কাজ করে তৈরি করেন থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া পণ্য।

হারানো মেয়ের নামেই ‘আফরা ফ্যাশন হাউস’ নামকরণ করে গড়ে তোলেন একটি ফ্যাশন হাউস। অনলাইনে চলে ব্যবসা। সারা দিন ব্যবসা ও সাংসারিক কাজে মগ্ন থেকে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন সুমি। এখন ঘরে বসেই প্রতিমাসে তার আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

সুমি জানান, কোলের ফুটফুটে মেয়েকে হারিয়ে নিজেকেও প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। স্বামীর উদ্যোগে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে এখন অনেকটাই ভালো আছি।

এদিকে ‘কঠোর লকডাউনে’ স্বামীর ব্যবসা যখন প্রায় অচল তখন সংসারের হাল ধরতে খাদি কাপড় নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন নাসরিন আক্তার সাথী নামে এক নারী। চান্দিনার উপজেলা সদর ‘ধানসিঁড়ি’ আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসায় অলাইনে খাদি কাপড় বিক্রি করে সফল ওই উদ্যোক্তা নারী।

মাত্র দুই হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ছয় মাসেই তার বিক্রি সাড়ে চার লাখ টাকা। চান্দিনা ও পার্শ্ববর্তী বরকামতা গ্রাম থেকে খাদি কাপড় কিনে নিজের পছন্দমতো নকশা করে থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি— এমনকি গামছা পর্যন্ত বিক্রি করছেন এই সাথী। বর্তমানে ওই ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

তিনি জানান, ঢাকায় অনার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিয়ে করি। ঢাকায় অধ্যয়নরত অবস্থায় মা বিলকিস আক্তার থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে প্রথমে অনলাইনে নারীদের কসমেটিকস ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু করোনাকালে ওই ব্যবসাও বেশিদূর এগোতে পারিনি। বাধ্য হয়ে চান্দিনায় চলে আসি। যেহেতু আমি চান্দিনার মেয়ে আর চান্দিনার খাদি নিয়ে অন্যরা বেশ এগোচ্ছে তখন আমিও খাদি নিয়ে কাজ শুরু করি। গড়ে তুলি ‘লেডিস কেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে আমার ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

অন্যদিকে পুলিশ অফিসারের স্ত্রী মীরা মজুমদার খাদিকে ভালোবেসে শখের বসে গড়ে তোলেন ‘ঈদিকা ফ্যাশন হাউস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিজ বাসায় চরকায় সুতা কাটা, কাপড় কাটা, নিজ হাতে পোশাক তৈরি, ব্লক ও নকশায় আধুনিক ডিজাইনে তৈরি করছেন খাদির বিভিন্ন পণ্য। তার তৈরি খাদি পোশাক দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় বসবাসরত বাঙালি গ্রাহকরাও।

মীরা মজুমদার জানান, আমি অনার্স শেষ করে বসেছিলাম। এর মধ্যেই করোনা মহামারি শুরু হয়ে গেল। চারদিকে হতাশা আর হতাশা। আমি সবসময় নিজেকে নিয়ে খুব হতাশায় ভুগতাম। আমি ভাবতাম যে আমার দ্বারা কিছুই হবে না। সাহস জোগায় আমার স্বামী। ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল আমার উদ্যোক্তা জীবনের পথ চলা শুরু। প্রথমত আমার বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৬ হাজার টাকা। টাঙ্গাইলের কয়েকটি শাড়ি দিয়ে শুরু করেছিলাম আমার উদ্যোক্তা জীবন। তাতে তেমন সাড়া না পেয়ে আবারও হতাশ হই।

তখন গুগলে সার্চ দিয়ে চান্দিনার খাদি সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম। খাদি কাপড় সম্পর্কে আমার কোনো প্রকার ধারণা ছিল না। কাজেই কোথায় তৈরি করা হয় তাও জানতাম না। তার পর একদিন বের হলাম খাদি সম্পর্কে জানার জন্য কয়েকজন থেকে ধারণা নিয়ে ছুটে যাই খাদি পল্লীতে। গ্রামীণ খাদি থেকে প্রথম খাদি কাপড় কিনেছি। পাঞ্জাবি শাড়ি ও ওড়না। খাদি কাপড় নিয়ে হেন্ড পেইন্টিং করে যেদিন পোস্ট করি ওই দিনই খাদি পাঞ্জাবির কাস্টমার পেলাম।

চেষ্টা করেছি ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড় কিনে নিজ হাতে ব্লক, চরকায় সুতা কেটে ওই সুতায় নকশা করে নতুন মাত্রা যোগ করতে। ক্রেতাদের সাড়াও পাচ্ছি ব্যাপক। খাদি পণ্য নিয়ে আরও প্রচার করলে এর চাহিদা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছি।

প্রসঙ্গত কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কালের বিবর্তনে প্রায় ধ্বংসের পথে ওই খাদি শিল্প। নতুন প্রজন্মের তরুণ উদ্যোক্তাদের অনলাইন ব্যবসায় খাদি কাপড়ে আধুনিকতা যোগ হওয়ায় খাদি কাপড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদাও বেড়েছে বেশ। এমন উদ্যোক্তাদের কল্যাণে ফিরে আসবে খাদির ঐতিহ্য এমনটিই মনে করছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত নারী উদ্যোক্তরা।